দুই দশকেরও বেশি সময়ের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে ইরাক থেকে শেষ ঘাঁটিগুলোও গুটিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক মিশন শেষ করার পরিকল্পনা অনুযায়ী এ প্রত্যাহার সম্পন্ন হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে কৌশলগতভাবে নিজেদের জন্য লাভজনক হিসেবে দেখছে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। তাদের মতে, ইরাকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান দেশটির রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তেহরানঘনিষ্ঠ শক্তিগুলোর প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও একই ধরনের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন।
ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ছায়া সংগঠন ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মোজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে।
তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ঘিরে ইরাকের ভেতরে উদ্বেগও রয়েছে। স্থানীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার পর ইরাকি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ইসলামিক স্টেট (আইএস) নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। কুর্দি কমান্ডারদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে আইএসের স্লিপার সেলগুলোর তৎপরতার কিছু লক্ষণ দেখা গেছে। মার্কিন প্রত্যাহারের পর গোয়েন্দা ও লজিস্টিক সহায়তার ঘাটতি তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ফালুজাহর এক সুন্নি উপজাতীয় নেতা বলেন, সব ইরাকিই পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চায়। তবে একই সময়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের চলে যাওয়ায় যে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হতে পারে, সেটিই উদ্বেগের বিষয়।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইরাকে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০১১ সালের শেষে মার্কিন সেনারা দেশটি থেকে সরে যায়।
তবে ২০১৪ সালে আইএসের উত্থানের পর সংগঠনটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করতে আবারও মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট ইরাকে ফিরে আসে। পরে ২০২৪ সালে ওয়াশিংটন ও বাগদাদ জোটের সামরিক মিশন ধীরে ধীরে শেষ করার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায়।
এবার সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের শেষ ধাপে এসে পৌঁছেছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রত্যাহার সম্পন্ন হলে ইরাকের নিরাপত্তার প্রধান দায়িত্ব আরও স্পষ্টভাবে দেশটির নিজস্ব বাহিনীর ওপর বর্তাবে।
ইরাক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। ফলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্যে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার ফলে ইরানঘনিষ্ঠ মিলিশিয়াগুলো নিজেদের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। একই সঙ্গে আইএসের মতো গোষ্ঠীগুলো সুযোগ নিলে ইরাককে নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
অর্থাৎ মার্কিন বাহিনীর বিদায়ের মধ্য দিয়ে ইরাক একদিকে দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির অবসান দেখছে, অন্যদিকে সামনে দাঁড়াচ্ছে নতুন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রশ্ন।