ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে তাদের ‘শাস্তিমূলক পদক্ষেপ’ অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তেহরানের কঠোর অবস্থানও বহাল রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির এক প্রতিবেদনে আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বির বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং এখন সেই অর্জনকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতায় রূপ দেওয়ার কাজ চলছে।
মোহেব্বির বক্তব্যে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তার দাবি, প্রণালিটিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য হলেও সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করেও ওয়াশিংটন সেটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
আইআরজিসির এই মুখপাত্র বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিকে কয়েক ঘণ্টার জন্যও স্বাভাবিকভাবে চালু রাখতে সক্ষম হয়নি।
হরমুজ নিয়ে অনড় তেহরান
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন করা হয়।
প্রণালিতে নৌ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচল, পরিবহন ব্যয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে।
তেহরানের অবস্থান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমানো এবং ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ প্রত্যাহারের মতো পদক্ষেপ নিলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে আইআরজিসির সর্বশেষ বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার অবস্থান থেকে সরে আসেনি ইরান।
‘সাত শর্ত’ কী?
আইআরজিসির মুখপাত্রের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উল্লেখ করা সাতটি শর্তের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার ক্ষেত্রে সামরিক চাপ হ্রাস, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল করার মতো বিষয় সামনে এসেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরছে।
ফলে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে এখনও বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
‘স্থায়ী প্রতিরোধক্ষমতা’ গড়ার বার্তা
মোহেব্বির বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রতিরোধের পরিকল্পনা। তিনি দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ইরান এমন একটি কৌশলগত সক্ষমতা তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের জন্য ঝুঁকি ও ব্যয় বাড়াবে।
তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রেস টিভি ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম হওয়ায় প্রতিবেদনে মূলত তেহরান ও আইআরজিসির অবস্থানই প্রতিফলিত হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, আইআরজিসির সর্বশেষ বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার আগে চাপ বজায় রাখার ইঙ্গিত মিলেছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও কিছু সময় অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।