সৌদি আরব ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল করেনি—মার্কিন একটি গোপন গোয়েন্দা মূল্যায়নে এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। এই তথ্য প্রকাশের পর সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে ওয়াশিংটনের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের পর্যালোচনার জন্য দেওয়া গোপন নথিতে সৌদি আরবের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই মূল্যায়ন অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পৃথক একটি মূল্যায়নে রিয়াদের দেওয়া আশ্বাস এবং প্রস্তাবিত সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর তুলনামূলক বেশি আস্থা প্রকাশ করা হয়েছে।
সৌদি-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে বিতর্ক
গত জুলাইয়ে স্বাক্ষরিত ‘সেকশন ১২৩’ চুক্তি সৌদি আরবে বেসামরিক পারমাণবিক প্রকল্পে মার্কিন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণের আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। এই প্রকল্পের সম্ভাব্য আর্থিক মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার।
ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সহযোগিতার আওতায় রাখলে অপ্রসারণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে রিয়াদ যাতে পারমাণবিক প্রযুক্তির জন্য রাশিয়া বা চীনের দিকে বেশি ঝুঁকে না পড়ে, সেটিও চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
তবে সমালোচকদের উদ্বেগের জায়গা হলো সৌদি আরবের নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা।
সমৃদ্ধকরণের মাত্রা নিয়েই বড় প্রশ্ন
চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে সৌদি আরবের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পাঁচ শতাংশের নিচে রাখার কথা রয়েছে। তবে পরবর্তী গবেষণা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের লিখিত সম্মতির মাধ্যমে সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুযোগ থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপযোগী নয়। তবে এই মাত্রায় পৌঁছানোর পর অস্ত্র-গ্রেডের ঘনত্বে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কমে যায়—এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে অপ্রসারণ বিশেষজ্ঞ ও মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
আইএইএর অতিরিক্ত প্রোটোকল নিয়ে প্রশ্ন
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অতিরিক্ত প্রোটোকল গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
অতিরিক্ত প্রোটোকল কার্যকর হলে আইএইএর পরিদর্শকরা একটি দেশের ঘোষণার বাইরে সম্ভাব্য পারমাণবিক কর্মকাণ্ড যাচাইয়ের জন্য আরও বিস্তৃত সুযোগ পান। এর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব আলাদা একটি দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনা করছে।
সমালোচকদের মতে, এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মার্কিন সিনেটরদের সতর্কবার্তা
চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে একদল ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে সতর্ক করেছেন। তাদের আশঙ্কা, অভ্যন্তরীণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ ভবিষ্যতে সৌদি আরবকে সামরিক পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে এগোনোর সম্ভাব্য পথ তৈরি করে দিতে পারে।
সিনেটররা বিশেষ করে প্রশ্ন তুলেছেন, রিয়াদ কেন নিজেদের ভূখণ্ডে সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা ধরে রাখতে এতটা আগ্রহী।
তবে মার্কিন প্রশাসন এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকে সমর্থন করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।
সৌদি পক্ষও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির সামরিক উদ্দেশ্য থাকার কথা অস্বীকার করেছে। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রী আবদুল আজিজ বিন সালমানের বক্তব্য অনুযায়ী, রিয়াদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হবে এবং তা দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে।
পুরোনো একটি বক্তব্য আবার সামনে
সৌদি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বর্তমান উদ্বেগের সঙ্গে দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ২০১৮ সালের একটি বক্তব্যও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তখন তিনি বলেছিলেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, সৌদি আরবও একই পথে এগোবে। ওই বক্তব্যের পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভাব্য পারমাণবিক প্রতিযোগিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক পরিকল্পনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতির মধ্যে সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইরান চুক্তির সঙ্গে তুলনা
মার্কিন আইনপ্রণেতাদের কেউ কেউ সৌদি আরবের সঙ্গে নতুন চুক্তির তুলনা করছেন ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে।
ওই চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ দীর্ঘ সময়ের জন্য ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার বিধান ছিল। ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যথেষ্ট কঠোর নয় বলে সমালোচনা করেন এবং পরে ওয়াশিংটন চুক্তি থেকে সরে যায়।
এখন সৌদি আরবকে তুলনামূলক বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়া হবে কি না, এবং তার বিনিময়ে কী ধরনের যাচাই ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে—সেটিই বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত কী হবে?
সৌদি-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তিটি ২৪ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে ৯০ দিনের পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।
আইনপ্রণেতারা চাইলে চুক্তিটি আটকে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারেন। তবে প্রেসিডেন্টের ভেটো অতিক্রম করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের পারমাণবিক কর্মসূচি আপাতত বেসামরিক ব্যবহারের কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে বলে রিয়াদ ও ওয়াশিংটন দাবি করছে। কিন্তু নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।