রাজধানীতে জাল-ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নিয়ম অনুযায়ী ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান প্রকৃত অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা চালাচ্ছে, আবার কেউ আসল লাইসেন্সের আদলে তৈরি কাগজপত্র ব্যবহার করে ব্যবসা বাণিজ্য করছেন। এদের চিহ্নিতের পাশপাশি ব্যবস্থা নেয়া শুরু করেছে দুই সিটি। ফলে যারা এখনো লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা করছেন তাদের সরাসরি দুই সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে ট্রেড লাইসেন্স নেয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। না হয় জরিমানাসহ প্রতিষ্ঠান, দোকান, মার্কেট স্থাপনা-মার্কেট সিলগালা করে মামলামাল ক্রোক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই সিটি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে জনসংখ্যার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভুয়া লাইসেন্স ব্যবহার। অভিযোগ রয়েছে, একটি চক্রের মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্সের আদলে নকল কাগজপত্র তৈরি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবসা পরিচালনা করছে। এতে একদিকে সিটি করপোরেশন হারাচ্ছে রাজস্ব, অন্যদিকে বাড়ছে অনিয়ম ও জননিরাপত্তার ঝুঁকি।
এদিকে, দক্ষিণ সিটির ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে উত্তর সিটিতে ব্যবসা ও উত্তর সিটির লাইসেন্স দিয়ে দক্ষিণ সিটিতে ব্যবসা করারও অভিযোগ রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। এছাড়াও অনেকে কোন লাইসেন্স না নিয়েই বছরের পর ব্যবসা করে আসছে। এরমধ্যে নিজেকে রক্ষায় অনেকে ভুয়া লাইসেন্স তৈরি করেও ব্যবসা করছেন। এদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে দুই সিটি। দোষীদের চিহ্নিতের পাশাপাশি অভিযান পরিচালনা করে নেয়া হচ্ছে ব্যবস্থা। এতে জরিমানাসহ দোকান, স্থাপনা ও মার্কেট সিলগালাসহ কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে দুই সিটি।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক থাকলেও কিছু প্রতিষ্ঠান প্রকৃত লাইসেন্স না নিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করছে। আবার কেউ কেউ মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য ব্যবহার করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষ করে আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম, গুদাম, কারখানা, রেস্টুরন্ট ও বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে লাইসেন্সের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কোথাও ব্যবসার ধরন এক হলেও লাইসেন্সে উল্লেখ করা হয়েছে ভিন্ন ধরনের কার্যক্রম। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ও মালিকানার তথ্যের সঙ্গেও লাইসেন্সের তথ্যের মিল পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুই সিটির তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা, ভাড়ার চুক্তিপত্র, কর পরিশোধের রসিদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ের পর ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়। মিথ্যা বা অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া হলে লাইসেন্স বাতিল এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। অনেকে ভোগান্তির কারণে লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন করে না করেই ব্যবসা কার্যক্রম চালচ্ছে। বর্তমানের ট্রেডলাইসেন্স অনলাইনে হলেও অনেকে অনলাইনে করতে না পেরে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক অফিসে নতুন লাইসেন্স করতে গেলে সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে দ্বিগুন টাকা নেয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে অনেকে বাধ্য হয়েই লাইসেন্স ছাড়া বা ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে ব্যবসা করছে। ফলে এধরনের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে দুই সিটি। দ্রুত লাইসেন্স না নিলে ও নবায়ন না করলে সেসব দোকান, স্থাপনা-মার্কেট সিলগালা করে মামলামাল ক্রোক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই সিটি।
এদিকে, ভুয়া ট্রেড লাইসেন্সের কারণে একদিকে যেমন সিটি করপোরেশন রাজস্ব হারাচ্ছে। অন্যদিকে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। একই সঙ্গে লাইসেন্সের নামে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি অনিয়ন্ত্রিত বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসা পরিচালনা করে, তাহলে জননিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে আসে। এদিকে, ডিজিটাল ব্যবস্থায় ট্রেড লাইসেন্স যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করেছে দুই সিটি। তাদের ই-ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থায় কিউআর কোড ও ইউনিক আইডেন্টিফায়ারের মাধ্যমে লাইসেন্সের সত্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত মাঠপর্যায়ে অভিযান, লাইসেন্সের তথ্যের সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বাস্তব তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে যাচাই জোরদার করা গেলে ভুয়া লাইসেন্সের ব্যবহার কমানো সম্ভব। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও দালাল বা অননুমোদিত ব্যক্তির মাধ্যমে লাইসেন্স না নিয়ে সরাসরি সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। না হয় যারা ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে ও লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা বাণিজ্য করছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে দক্ষিণ সিটির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো: আমিনুল ইসলাম বলেন, ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে। এরইমধ্যে অনেককে চিহ্নিত করে জরিমানা করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরো কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।