ইচ্ছামতো ভাড়া নিচ্ছে পরিবহন মালিকরা

আজহারুল হক ফরাজী

জাতীয়

জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর সরকার বাসের ভাড়া কিলোমিটারে বাড়িয়েছে মাত্র ১৭ পয়সা। কিন্তু মাঠের চিত্র যেন

2026-09-24T12:32:59+00:00
2026-09-24T12:32:59+00:00
  শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১১ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
ইচ্ছামতো ভাড়া নিচ্ছে পরিবহন মালিকরা
কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়িয়েছে সরকার কিন্তু বাস্তবে ৫ থেকে ২০০ টাকা বেশি আদায়
আজহারুল হক ফরাজী
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩২ পিএম 
প্রতীকী ছবি
জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর সরকার বাসের ভাড়া কিলোমিটারে বাড়িয়েছে মাত্র ১৭ পয়সা। কিন্তু মাঠের চিত্র যেন সম্পূর্ণ উল্টো। বাস মালিকরা সরকারি নতুন ভাড়ার তালিকা পাত্তা না দিয়ে নিজেদের খেয়াল খুশি মত অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। স্থান ও দূরত্বভেদে কোথাও ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা, ১৫ টাকার ভাড়া ২০ টাকা; কোথাও প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা করে বাড়তি আদায় করা হচ্ছে। দূরপাল্লার বাসে আবার ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। 

গতকাল ঢাকার সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে গিয়ে দূরপাল্লার বিভিন্ন বাসে সরকারি নতুন তালিকার বাইরে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়ার চিত্র পাওয়া যায়। গোপালগঞ্জগামী এক যাত্রী জানান, সাধারণ বাসের দুটি টিকিটের জন্য তাঁকে ১ হাজার ১০০ টাকা দিতে হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, কোনো বাসেই কম নেওয়া হচ্ছে না; যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা করে বাড়তি নেওয়া হচ্ছে।

রাজধানীর ভেতরেও একই চিত্র। কোনো রুটে ১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা, আবার ১৫ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা। অর্থাৎ পাঁচ টাকা করে বাড়তি আদায় হচ্ছে এমন ছোট দূরত্বেও, যেখানে সরকারের কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বৃদ্ধির হিসাবের সঙ্গে এই বাড়তি ভাড়ার কোনো সামঞ্জস্য নেই।

নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা রুটের মৌমিতা পরিবহনের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। বাসে উঠেই যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া নিয়ে আপত্তি তোলেন। একপর্যায়ে চালকের সহকারী সাদ্দাম হোসেন জানান, তাঁরা প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা করে বেশি নিচ্ছেন। অর্থাৎ সরকারি নতুন ভাড়া তালিকা কার্যকর না করে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বাসের হেলপাররা।

এখানেই শেষ নয়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলেও দূরত্বভেদে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার চিত্র পাওয়া গেছে। তবে অ্যাপভিত্তিক রাইডের ভাড়া একই থাকায় চালকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে । অনেক চালক বলছেন, বাড়তি জ্বালানি খরচে আগের ভাড়ায় রাইড দেওয়া তাঁদের পোষাচ্ছে না। তাই তারা অ্যাপে যাত্রী নিচ্ছেন না।

রাইডার সেলিম হোসেন জানান, প্রতি ট্রিপে তাঁর আয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। কিন্তু যাত্রী নামিয়ে পরবর্তী ট্রিপ পেতে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। সেই সময়ে নাস্তা বা অন্যান্য খরচ হলে প্রতি ট্রিপের আয়ের প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত চলে যায়। তাঁর মাসিক খরচ ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা হলেও আয় বাড়েনি।

বিজয় সরণিতে রাইডের অপেক্ষায় থাকা ওবায়দুল্লাহর দিনশেষে আয় হয়েছে মাত্র ৩০০ টাকা। তাঁর বক্তব্য, তেলের দাম বাড়ার পর যাত্রী কমে গেছে, অ্যাপেও ভাড়া বাড়েনি। আরেক চালক কবির মিয়া জানান, উবার বা পাঠাওয়ের ভাড়া কম হওয়ায় তিনি অনেক রাইডই নিচ্ছেন না।

অর্থাৎ একই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাতে পরিবহন খাতে তৈরি হয়েছে দুই বিপরীত চিত্র—বাস-লঞ্চে যাত্রীর কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, আর অ্যাপভিত্তিক রাইডে নির্ধারিত ভাড়া অপরিবর্তিত থাকায় চালকেরা বাড়তি খরচ সামলাতে পারছেন না। এর মধ্যেই কিছু ক্ষেত্রে চালকেরা যাত্রীকে সরাসরি বাড়তি ভাড়া দিতে বলছেন।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। মিনিবাসে ২ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ টাকা ৬০ পয়সা। দূরপাল্লার ৫২ আসনের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ টাকা ৪০ পয়সা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৃদ্ধি ১৭ পয়সা।
কিন্তু মাঠের হিসাব বলছে, সেই ১৭ পয়সার সঙ্গে বাস্তব ভাড়ার ব্যবধান অনেক বেশি। একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের সরকারি ভাড়া যেখানে কিলোমিটারপ্রতি সামান্য হারে বাড়ার কথা, সেখানে যাত্রীকে স্টপেজপ্রতি পাঁচ টাকা বা টিকিটপ্রতি ৫০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। দূরপাল্লার ক্ষেত্রে সেই বাড়তি আদায় ২০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।

লঞ্চেও সরকারি নির্ধারিত নতুন ভাড়ার বদলে মালিক সমিতির সিদ্ধান্তে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। ঢাকা-বরিশাল রুটে ডেকের ভাড়া ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন খাতের বিভিন্ন অংশে ভাড়া সমন্বয়ের নামে যাত্রীর ওপর বাড়তি ব্যয় চাপছে।

পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও বাড়তি ভাড়ার লাগাম নেই। বিভিন্ন পথে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানে ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি চাওয়া হচ্ছে। বেনাপোল থেকে কাঁচপুরে সাড়ে ১০ টন গার্মেন্টস পণ্য পরিবহনের ভাড়া ১৮-১৯ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২২ হাজার টাকা হয়েছে। কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চালের ভাড়া ২০ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার টাকা।

এতে পরিবহন খাতের বাড়তি ব্যয় শুধু যাত্রীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ায় সেই ব্যয় যোগ হচ্ছে পণ্যের দামে। ফলে পরিবহন ভাড়ার নৈরাজ্যের পরবর্তী ধাক্কা যেতে পারে নিত্যপণ্যের বাজারে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি বিবেচনায় জনগণের ওপর চাপ কম রাখতে ভাড়া সীমিত হারে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু মাঠে যদি সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে পরিবহনগুলো নিজেদের মতো করে টাকা নেয়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে- সরকারি ভাড়া নির্ধারণের পরও যাত্রীকে বাড়তি টাকা গুনতে হবে কেন?



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: