জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে এবার ভাষণ দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে তাঁর পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার নজির তৈরি হচ্ছে। ৮১তম অধিবেশনে এটিই হবে তাঁর প্রথম ভাষণ।
নিউইয়র্ক সময় বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সাধারণ পরিষদের হলে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। বিকেলের অধিবেশনে ১৮ জন বক্তার মধ্যে তিনি ১১তম বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন। ভাষণের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ১৫ মিনিট।
প্রধানমন্ত্রী বাংলায় ভাষণ দেবেন। এতে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরার কথা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানবিক সংকট এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে গুরুত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, উন্নয়নের অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সংকটের টেকসই সমাধানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও জলবায়ু অর্থায়নের বিষয়ও উঠে আসতে পারে।
চার দশকের পারিবারিক ধারায় তৃতীয় নাম তারেক
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সঙ্গে তারেক রহমানের পরিবারের সম্পৃক্ততা নতুন নয়। পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে ভাষণ দেন তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে তিনি বক্তব্য দেন।
জিয়াউর রহমানের ভাষণে ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যকার ব্যবধান, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পায়। শান্তি, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বানও জানান তিনি।
এর ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দেন তারেক রহমানের মা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে তিনি মোট পাঁচবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেন।
এ ছাড়া ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ সভা, ২০০২ সালে শিশুদের বিষয়ক ২৭তম বিশেষ অধিবেশন এবং ২০০৫ সালে ৬০তম অধিবেশন চলাকালে দুটি পৃথক সভাতেও বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া।
ফলে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পর এবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান।
বাংলাদেশের জন্যও বিশেষ তাৎপর্যের অধিবেশন
এবারের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্যও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বর্তমানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২ জুন ২০২৬ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন।
ভাষণের আগে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলা নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় অংশ নেওয়া ও উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফ সংযুক্তি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে।
দিনের কর্মসূচিতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গে বৈঠকও রয়েছে।
নিউইয়র্কে ব্যস্ত কূটনৈতিক কর্মসূচি
৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর থেকে তারেক রহমান ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। ২২ সেপ্টেম্বর তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজিত প্রাতরাশ সভা ও সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
সেদিন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, মালদ্বীপের ভাইস-প্রেসিডেন্ট উজ হোসেন মোহাম্মদ লতিফ, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিলস-এমে এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়।
২৩ সেপ্টেম্বর তিনি আন্তর্জাতিক জনহিতকর ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেন। একই দিনে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রে প্লেনকোভিচের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায্য রূপান্তরবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ শেষে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে আয়োজিত নৈশভোজে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ছাড়ার আগে ম্যানহাটনে জেপি মরগানের সদর দপ্তরে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক এবং কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।