জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে আগামীকাল বৃহস্পতিবার নিজের প্রথম ঐতিহাসিক ভাষণ দিবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্বের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চে তিনি বাংলায় এই ভাষণ উপস্থাপন করবেন। বিশ্বনেতাদের সামনে তিনি উদ্বোধনী ভাষণে দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের স্বদেশে টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো সহযোগিতা দাবি করবেন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের লড়াকু অবস্থান, এর জন্য বিদেশী অর্থায়নের দাবি এবং পরিবেশ রক্ষায় খাল খনন ও দেশের অভ্যন্তরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপের কথা বিশ্ববাসীকে অবহিত করবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সবচেয়ে অগ্রাধিকার পাওয়া অন্যতম ইস্যু হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট। দীর্ঘদিনের এই সমস্যাকে একটি ‘চলমান সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে এর ব্যাপকতা নানা চ্যালেঞ্জ তুলে ধরবে। প্রধানমন্ত্রী বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট বার্তায় বলবেন, বাংলাদেশে অবস্থান করা বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের নিজ দেশে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই উপায়ে ফেরত পাঠানোই এই সমস্যার একমাত্র স্থায়ী সমাধান। অধিবেশনের মূল ভাষণের পাশাপাশি আজ বুধবার বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ সাইড ইভেন্টে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। যেখানে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়া হবে।
দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র শান্তিপূর্ণ সমাধান হলো তাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আজ সংকট নিরসনে সাত দফা পদক্ষেপের প্রস্তাব করেছেন।
গতবছরের ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলেন। পরবর্তীতে ১ লক্ষ রোহিঙ্গা দ্রুত সময়ের মধ্যে নিজ দেশে ফেরত যাবেন বলেও দেশবাসীকে আস্বস্ত করেন এবং এ বিষয়ে বিশ্বনেতাদের সঙ্গেও তার কথা চ’ড়ান্ত হয়েছে বলে জানান। যদিও এরপরে প্রত্যাবাসনের পরিবর্তে উল্টো হাজার হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। এই কারনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের সামনে জোড়ালোভাবে রোহিঙ্গা সংকট উপস্থাপন করবেন।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান জাতিসংঘে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তুলে ধরা হবে। জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ স্পষ্ট দাবি তুলবে যে, যেসব শিল্পোন্নত দেশ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন (গ্র্যান্ট-বেসড ক্লাইমেট ফিন্যান্স) প্রদান করা তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি জনিত অস্তিত্বের ঝুঁকি বিষয়ক বৈঠকের উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য দেবেন।
পরিবেশ সংরক্ষণে বর্তমান সরকারের বাস্তবমুখী পদক্ষেপগুলো বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী জানাবেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দেশে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগিয়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিশেষ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি খাল খনন ও পুনঃখনন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলোর কথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হবে, যা আন্তর্জাতিক সবুজ বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
ওদিকে জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং গণমানুষের অধিকার সুরক্ষার কথা জোর দিয়ে বলা হবে। বিদেশে অবৈধভাবে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ বাংলাদেশে ফেরত আনার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা ও কার্যকর কাঠামোর আহ্বান জানাবেন সরকারপ্রধান। এছাড়া অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে বাণিজ্য ও বৈশ্বিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, তরুণ ও নারী ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, দক্ষ ধাত্রীসেবা ও মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো সামাজিক খাতসমূহ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণে সরকারের লক্ষ্য তুলে ধরা হবে। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বহুপক্ষীয় জাতিসংঘ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপরও জোর দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এবারের জাতিসংঘ অধিবেশন বাংলাদেশের কূটনীতির ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। প্রথমত, সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, যা বৈশ্বিক দরবারে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। দ্বিতীয়ত, এই সফরের মাধ্যমে একই পরিবারের তিন শীর্ষ নেতার জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি হলো। এর আগে ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং ২০০৫ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছিলেন; এবার তাঁদের সন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সংক্ষিপ্ত ও নিবিড় এই সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মাত্র ৩৫ জনের এক ছোট সরকারি প্রতিনিধিদল নিয়ে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে বিশেষ নৈশভোজে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের কথা রয়েছে। এছাড়া কুয়েত, কানাডা, থাইল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, পাকিস্তান ও ভুটানের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা হবে। সমস্ত অনুষ্ঠান শেষে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার উদ্দেশে নিউইয়র্ক ত্যাগ করবেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল মঙ্গলবার থেকে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক সফর শুরু হয়েছে। সকাল ৯টায় তিনি জাতিসংঘ সদর দপ্তরে উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশ নেন, যেখানে সব দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে একটি ‘ওয়েলকাম ব্রেকফাস্ট রিসেপশনে’ যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। এই সফরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলাদা কোনো বৈঠকের সুযোগ আছে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরের মূল উদ্দেশ্য জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদান। তাই আলাদা করে এ ধরনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার তেমন সুযোগ হবে না।