গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বাড়ছে ভ্যাটের আওতা

এসএম শামসুজ্জোহা

বাণিজ্য

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব আয় বাড়াতে এবার একেবারে গ্রাম ও ইউনিয়ন, উপজেলা পর্যায় থেকে ভ্যাট বা কর আদায়ের নতুন

2026-09-23T13:45:53+00:00
2026-09-23T13:45:53+00:00
  শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১০ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাণিজ্য
ছাড় পাবে না ছোট ব্যবসাও
গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বাড়ছে ভ্যাটের আওতা
আয় বাড়াতে গ্রামের ছোট দোকান থেকেও ভ্যাট নেবে এনবিআর
এসএম শামসুজ্জোহা
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৪৫ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব আয় বাড়াতে এবার একেবারে গ্রাম ও ইউনিয়ন, উপজেলা পর্যায় থেকে ভ্যাট বা কর আদায়ের নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। গ্রামের বা ইউনিয়ন পর্যায়ের ছোট দোকান ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসে নির্দিষ্ট হারে (যেমন ৫০০ টাকা) ভ্যাট আদায়ের উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। যার মূল লক্ষ্য করজাল বা ভ্যাটের ভিত্তিপ্রস্তর তৃণমূল পর্যন্ত প্রসারিত করা এবং রাজস্ব আয় বাড়ানো। অপরদিকে নতুন ত্রৈমাসিক রিটার্ন ব্যবস্থায় ভ্যাট আদায় কমে যাওয়ায় আবারও পুরোনো মাসিক পদ্ধতিতে ফেরার চিন্তা করছে সরকার। ফলে ভ্যাট ব্যবস্থায় একই সময়ে দুই ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ সামনে এসেছে- করজালের পরিধি বাড়বে নিচের দিকে, আর আদায়ের সময়সীমা কমবে ওপরের দিকে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, দেশের অর্থনীতিতে গ্রামীণ অঞ্চলের অবদান ক্রমাগত বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না রাজস্ব আহরণ। এই বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে করের কাঠামোর মধ্যে আনতে এবার বড় ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এনবিআর। আগামী এক বছরের মধ্যে তারা ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বর্তমান ৮ লাখ থেকে ২০ লাখে উন্নীত করতে চায়। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সারা দেশে ভ্যাট নিবন্ধন কার্যক্রম বিস্তৃত করা হচ্ছে। এনবিআরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জানান, মূলত ভ্যাট নিবন্ধনের আওতা বাড়াতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখনো নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছে। তাই এবার সারা দেশে নিবন্ধন বাড়াতে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। গত মাসের শুরু থেকে এসব চিঠি পাঠানো শুরু হয়েছে। চিঠিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা ও ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর দিতে বলা হয়েছে। ই-মেইলে পূর্ণাঙ্গ তালিকার একটি এক্সেল ফরম্যাট পাঠাতে বলা হয়েছে।

এই পরিকল্পনার আওতায় গ্রামীণ ও মফস্বল শহরের ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য মাসিক ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকার একটি স্থায়ী ‘টোকেন’ ভ্যাট পদ্ধতি চালু হতে পারে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এখন থেকে যেকোনো ধরনের ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাব পরিচালনা এবং ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি বা নবায়নের ক্ষেত্রে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এরআগে সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন সাপেক্ষে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভ্যাট কনসালট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাসানুল ইসলাম টিপুর মতে, শুধু ত্রৈমাসিক রিটার্নের কারণেই ভ্যাট আদায় কমেছে- এমনটা বলা ঠিক হবে না। অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি এবং অন্যান্য অনেক বিষয় ভ্যাট আদায়ের ওপর প্রভাব ফেলে।

সারাদেশে দোকানের তালিকা করছে এনবিআর : নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাজার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে ভ্যাট বিভাগ। কোথায় কত দোকান, কী ধরনের ব্যবসা, দোকানের অবস্থান, বিপণিবিতানের ধরন- এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এনবিআরের সংগৃহীত একটি তালিকায় দেখা গেছে, ঠাকুরগাঁও সদরের নুর নাহার প্লাজায় দোকান রয়েছে ৫২টি। এর মধ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি রয়েছে এমন দোকান চারটি। রংপুর সিটির বেতপট্টি বাজারে দোকান রয়েছে ১২১টি। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার রৌমারী বাজারে দোকানের সংখ্যা ৫০। এভাবে দেশের বিভিন্ন উপজেলা ও বাজারের তথ্য সংগ্রহ করে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির চেষ্টা চলছে। তালিকা তৈরির পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে কোনো ব্যবসায়ী এই নির্ধারিত ভ্যাটের আওতায় আসবেন, সেটি চূড়ান্ত করা হবে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন ভ্যাট আদায়ের মাঠপর্যায়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তার বক্তব্য, ভ্যাট আদায়ের সময় কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক ‘শুভেচ্ছা বিনিময়ের’ যে সংস্কৃতি রয়েছে, তা বন্ধ না করলে নিয়ম পরিবর্তনের সুফল মিলবে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা ১ কোটি ১৭ লাখে দাঁড়িয়েছে, যার প্রায় ৭৪ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত। অথচ, এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে মাত্র ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের বিআইএন রয়েছে, যার মধ্যে নিয়মিত রিটার্ন জমা দেয় মাত্র ৫ লাখের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান। এই বিশাল ব্যবধান দূর করতে অন্তত ১ কোটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছে রাজস্ব প্রশাসন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকেই মোট রাজস্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে। যদিও দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের অর্ধেকের বেশি ঢাকার বাইরে সংগঠিত হয়। আঞ্চলিক এই বৈষম্য দূর করতে তৃণমূলের রাজস্ব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এনবিআরের এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এই উদ্যোগকে ইতিবাচক মনে করলেও মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ যাতে সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় এবং এর আড়ালে যেন ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের হয়রানি বা ঘুষের শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ‘টোকেন ভ্যাট’ ব্যবস্থা অনেকটা অতীতে বাতিল হওয়া প্যাকেজ ভ্যাটের মতো। এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন সতর্ক করে বলেন, অতীতে এই ব্যবস্থায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীদের যোগসাজশের কারণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছিল। পর্যাপ্ত সুরক্ষা ও ডিজিটাল তদারকি ছাড়া পুনরায় একই পদ্ধতি চালু করলে পুরনো সমস্যাগুলো আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে।



Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: