কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, শুধু আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে—পুলিশের এমন বক্তব্যের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।
সোমবার দুপুরে অপ্রতিম হত্যার প্রতিবাদ ও সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। পরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে তাঁদের বিভিন্ন প্রশ্ন ও দাবি তুলে ধরা হয়।
শিক্ষার্থীরা বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানান তাঁরা।
এর আগে রবিবার কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান দাবি করেন, অপ্রতিমের মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় অপ্রতিম বাধা দিলে তাঁকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করে ফোনটি নিয়ে তিনজন ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়।
তবে পুলিশের এই বক্তব্য পুরোপুরি গ্রহণ করছেন না কুবি শিক্ষার্থীদের একাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জাতীয় ছাত্রশক্তি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার আহ্বায়ক নাঈম ভূঁইয়া বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি জানান, ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে অপ্রতিমের বাবা সদর দক্ষিণ থানায় ছেলের নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর পুলিশ যথাযথ তৎপরতা দেখিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
শিক্ষার্থী কাজী মিরাজ পুলিশের ‘আইফোনের জন্য হত্যা’ তত্ত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জীবনযাপন, তাঁদের কাছে থাকা দামি মুঠোফোন ও মোটরসাইকেলের বিষয়গুলোও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
তাঁর ভাষ্য, গ্রেপ্তার তুহিনের বিরুদ্ধে আগে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগ ছিল। এসব বিষয় অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পৃক্ত কি না, তা তদন্ত করে বের করার দাবি জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সদস্যসচিব মোহাম্মদ আবুল বাশার বলেন, তদন্তের স্বার্থে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু তথ্য এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে তাঁদের জানানো হয়েছে। তবে তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ সামনে আনার দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, অপ্রতিম হত্যার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করে তাঁর মা নাহিদা বেগমকে হত্যার প্রকৃত কারণ জানানো প্রয়োজন।
অন্যদিকে শিক্ষার্থী ও ছাত্র অধিকার পরিষদের মহানগর সভাপতি সাইফ হোসেন দাবি করেন, অপ্রতিমের বয়স ১৯ বছর হলেও তাঁকে ১৫ বছর দেখিয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
গত শুক্রবার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ হন অপ্রতিম। পরদিন কুবির অদূরের একটি জঙ্গল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরে অপ্রতিমের হাতে থাকা আইফোনের ক্ষুদে বার্তা ও সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে তুহিন (১৯), ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর এবং মো. সিয়ামকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে সিয়াম ছাড়া অপর তিনজন রোববার রাতে কুমিল্লার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
তবে অপ্রতিম হত্যার পেছনে শুধু আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যই ছিল কি না, নাকি এর নেপথ্যে আরও কোনো কারণ রয়েছে—এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।