যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে মারধরের পর শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে হত্যার মামলায় স্বামী দুলাল হোসেন ওরফে দুলু ওরফে জুয়েলকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ঘটনার প্রায় ১০ বছর পর রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) এ রায় ঘোষণা করা হয়।
ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান এ রায় দেন। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে।
রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. এরশাদ আলম (জর্জ)। তিনি জানান, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থদণ্ডের টাকা আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দেওয়ার জন্য ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা কালেক্টরকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
তবে মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় দুলালের ভাই হারুন, ভাবি মোরশেনা, বোন সুমাইয়া এবং বোন জামাই রাজুকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় শারমিনকে
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০১ সালে দুলাল হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয় শারমিনের। তাদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য শারমিনকে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, দুলাল তার পরিবারের অন্য সদস্যদের প্ররোচনায় শারমিনের পরিবারের কাছে দুই লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে আসছিলেন। যৌতুকের টাকা না পেয়ে বিভিন্ন সময় তাকে মারধরও করা হতো।
২০১৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে যৌতুকের দাবিতে শারমিনকে মারধর করা হয়। পরে তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে ম্যাচের কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
শারমিনের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করেন। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় প্রথমে তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
খবর পেয়ে শারমিনের মা মোসা. মোমেলা হাসপাতালে গিয়ে মেয়েকে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখতে পান। চিকিৎসকদের কাছ থেকে জানতে পারেন, তার শরীরের প্রায় ৮৫ শতাংশ পুড়ে গেছে।
দীর্ঘ ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর ৩০ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শারমিন।
মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় শারমিনের মা মোমেলা কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় দুলালসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় দুলালের মা জরিনা বেগমসহ পরিবারের সদস্যদের আসামি করা হয়।
২০১৭ সালের ৩১ জানুয়ারি মামলার তদন্ত শেষে ছয়জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন কেরানীগঞ্জ মডেল থানার উপপরিদর্শক এ কে এম সাইদুজ্জামান।
পরে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। বিচার চলাকালে আদালত মোট নয়জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
তবে বিচার চলাকালেই মামলার অন্যতম আসামি জরিনা বেগম মারা যান।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে রোববার আদালত দুলাল হোসেনকে মৃত্যুদণ্ড ও দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন। আর অপর চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়।