ব্যবসায় সহজীকরণে বিদ্যমান কোম্পানি আইনে বড় ধরনের বাঁকবদল হচ্ছে। আসছে ছোট-বড় কিছু পরিবর্তন ও সংস্কারের উদ্যোগ। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটছে এক ব্যক্তির কোম্পানি করার সুযোগের ক্ষেত্রে। যা দেশে একবারেই নতুন। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতা কমাতে কোম্পানির সংঘস্মারক সংশোধনে আদালতের পরিবর্তে রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে অনুমোদনের ব্যবস্থাও আনার প্রস্তাব রয়েছে। প্রায় তিন যুগের পুরোনো কোম্পানি আইন নতুন প্রজন্মের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারের এই প্রক্রিয়ায় দেশের ব্যবসায়ীদের সক্রিয় ও গঠনমূলক ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, এই আইন মূলত ব্যবহার করবেন ব্যবসায়ীরাই। তাই তাদের প্রয়োজন, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ চাহিদার ভিত্তিতেই আইনটিকে যুগোপযোগী করতে হবে। সম্প্রতি এ আইনের খসড়া সংশোধনীসমূহের ওপর সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়ার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
জানা গেছে, দেশে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, ডিজিটালাইজেশন জোরদার এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ সংশোধন করে ‘কোম্পানি (তৃতীয় সংশোধন) আইন, ২০২৬’ করতে যাচ্ছে সরকার। নতুন আইনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে কোম্পানি নিবন্ধন, প্রকৃত মালিকানা তথ্য উন্মক্ত করা, ইলেকট্রনিক শেয়ার রেজিস্টার এবং শেয়ার হস্তান্তরের সত্যতা যাচাইয়ের মতো একাধিক নতুন বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনটির সার্বিক আধুনিকায়ন ও বৈশ্বিক মানদন্ডে উন্নীত করার লক্ষ্যে মূলতঃ পাঁচটি কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ব্যবসা পরিচালন প্রক্রিয়া সহজ করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য দরজা কপাট উন্মুক্ত করা, তথ্যপ্রযুক্তির সর্বাত্মক ব্যবহার নিশ্চিত করা, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার আইনি ভিত্তি দেওয়া এবং ব্যবসায়িক অঙ্গনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
খসড়া সংশোধনী বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রস্তাবিত পরিবর্তনের অন্যতম বড় দিক হলো কোম্পানির প্রকৃত মালিকানা শনাক্ত করা। নতুন সংজ্ঞায় বেনিফিসিয়াল ওনারশিপ (বিও) বলতে শুধু কাগজে-কলমে শেয়ারধারী ব্যক্তিকে নয়, সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিকেও বোঝানো হয়েছে। এমনকি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিয়োগ-অপসারণে ক্ষমতাবান কিংবা দৈনন্দিন কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিকেও এর আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে প্রস্তাবিত ৩৪(ক) ধারায় কোনো শেয়ারের রেজিস্টারে একজনের নাম থাকলেও প্রকৃত সুবিধাভোগী বা মালিক অন্য কেউ হলে সেই প্রকৃত মালিকের নাম ও অন্যান্য তথ্য ঘোষণা করার বিধান রাখা হয়েছে। তথ্যমতে, মালিকানায় পরিবর্তন হলে ৩০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত ফরমে নতুন ঘোষণা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তথ্য না দিলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত সর্বোচ্চ ১০০ টাকা জরিমানার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু শেয়ারধারীর ওপর নয়, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকেও এই তথ্য রেজিস্টারে সংরক্ষণ করে ৩০ দিনের মধ্যে রেজিস্ট্রারের কাছে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। কোম্পানি তা করতে ব্যর্থ হলে কোম্পানি ও দায়ী কর্মকর্তার জন্যও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি প্রয়োজনীয় প্রকৃত মালিকানা ঘোষণা না করা হলে ওই শেয়ারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার কার্যকর না হওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। জানতে চাইলে বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান জানিয়েছেন, ‘কয়েক দিন আগে আমরা একটা বৈঠক করেছিলাম। এতে মত এসেছে, নতুন কোম্পানি আইন তৈরির দরকার নেই। কয়েকটি ধারা সংশোধন করলেই চলবে।’
কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কোম্পানি গঠন, পরিচালনা এবং কোনো ধরনের বিরোধ তৈরি হলে সেটি প্রতিকারের পথ বাতলিয়ে দেয় কোম্পানি আইন। কিন্তু আইনটা যুগোপোযোগী না হওয়ায়, এই আইনের অনেক কিছুই বাস্তবায়ন সহজ নয়। এছাড়াও আইনে অনেক বিষয় অস্পষ্ট থাকায় সেটির কারণে আদালতে প্রচুর পরিমাণ মামলা হচ্ছে। যেগুলো নিষ্পত্তিতে লাগে দীর্ঘ সময়। বিশ্বব্যাংকের ইজ অব ডুয়িং বিজনেস ইনডেক্স অনুসারে, চুক্তি কার্যকর করার ক্ষেত্রে ১৯০টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশ ১৮৯ তম স্থানে রয়েছে। এটি এমন একটি সূচক, যার মাধ্যমে বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ব্যয়িত সময় এবং ব্যয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার গুণমান পরিমাপ করে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশের কোম্পানি আইনের সাথে আমাদের আইনের অনেক ব্যবধান রয়েছে। ফলে ওসব দেশের আইন-আদালত ব্যবসাবান্ধব হওয়ায় তার আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। কোম্পানি আইনে বাণিজ্য সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আদালতের পরিমাণ উল্লেখ নেই, অথচ লাখ লাখ মামলা আসে। যে মামলাগুলো প্রচলিত আদালতে বিচার হচ্ছে।
আরজেএসসি হিসাব অনুযায়ী, দেশে ২ লক্ষ ৭৯ হাজার ১৬৭টি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি, ফরেইন কোম্পানি, পার্টনারশিপ ফার্ম এবং ওয়ান পারসন কোম্পানি রয়েছে। হাইকোর্ট ও বিচারিক আদালতে বাণিজ্য সংক্রান্ত প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার মামলা এখনো পর্যন্ত অনিষ্পন্ন রয়েছে। যে মামলাগুলোর সাথে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার লেন-দেন সংক্রান্ত বিরোধ জড়িত। এসব মামলার মধ্যে বিদশি বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির সাথে বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির মামলা প্রায় ৩৪ হাজার। এছাড়াও দুই লাখ ১১ হাজার মামলার মধ্যে দশ বছরেরও বেশি পুরনো মামলা রয়েছে প্রায় ৩৯ হাজার। প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হস্তান্তর সংক্রান্ত বিরোধ, মালিকানা নিয়ে বিরোধ, চুক্তি লংঘন সংক্রান্ত বিরোধ, প্রতারণা, বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিরোধ, মানহীন পণ্য সরবরাহ সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে এসব মামলার অভিযোগে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে সার্কভুক্ত দেশগুলোর এক স্টাডিতে উঠে এসেছে, বাণিজ্য বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তির অভাবে প্রতিবছর বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়। আর শুধু বাংলাদেশেই এ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এ ব্যাপারে কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার তানজীব-উল-আলম বলেন, ‘আদালতে মামলা দ্রুত নিষ্পতি না হওয়ায় কোম্পানি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছে। ফলে অনেক বড় প্রতিষ্ঠান এমনকি বিদেশি কোম্পানিও সহজে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছে না বাংলাদেশে।’ এছাড়াও বর্তমান কোম্পানি আইনে অনেক বিষয় নিয়ে কোনো বিধান নেই। ফলে সেটি নিয়েও আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়, যোগ করেন তানজীব-উল-আলম।