আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা প্রায় দ্বিগুণ এবং জামানতের পরিমাণ পাঁচ গুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক না রাখার বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ফলে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে প্রার্থিতা পেতে শিক্ষাগত সনদের কোনো শর্ত থাকছে না।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডের ভোটার হতে হবে এবং বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২৫ বছর হতে হবে। একই সঙ্গে প্রজাতন্ত্র, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা পরিষদের কোনো লাভজনক পদে থাকা ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। তবে চেয়ারম্যান বা সদস্য—কোনো পদেই প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই। এছাড়া আইন অনুযায়ী অন্যান্য যোগ্যতা-অযোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে হবে।
ইউপি নির্বাচন বিধিমালার সংশোধনীতে চেয়ারম্যান প্রার্থীর সর্বোচ্চ নির্বাচনি ব্যয় ৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য প্রার্থীর ব্যয়সীমা ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার টাকা এবং সদস্য প্রার্থীর জামানত ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে সংশোধনীটি আইন মন্ত্রণালয় থেকে ভেটিং হয়ে নির্বাচন কমিশনে এসেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহে এসআরও নম্বর দেওয়ার জন্য এটি আবার আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিধিমালার সংশোধনীও চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি চলছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিধিমালা ভেটিং হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, চলতি বছরই অন্তত কিছু স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করছে কমিশন। চলতি মাসেই তপশিল ঘোষণা হতে পারে এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে ভোটের সময় নির্ধারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় নিচ্ছে ইসি। কারণ ভোটকেন্দ্র হিসেবে স্কুল-কলেজ ব্যবহার করা হয় এবং এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করেন। তাই পরীক্ষা চলাকালে ভোট আয়োজন করা কঠিন। সম্ভব হলে বার্ষিক পরীক্ষার আগেই এক ধাপ নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে থাকছে না কোনো শর্ত
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা না থাকার বিষয়টি নতুন করে স্পষ্ট করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের পাঁচটি আইনের কোথাও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়নি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য—দুই পদেই প্রার্থী হওয়ার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। একইভাবে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর এবং সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর পদেও শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, একজন সমাজসেবক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত না হলেও স্বশিক্ষিত হতে পারেন। জনপ্রতিনিধি হওয়ার ক্ষেত্রে তার যোগ্যতা ও সক্ষমতাই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সাংবিধানিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থিতা নিয়ে সিদ্ধান্ত ইসির
এদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন কি না, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার আইন, নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের এমপিও নীতিমালা—সবকিছু পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন।
স্থানীয় সরকার আইনে প্রজাতন্ত্র, পরিষদ বা কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের লাভজনক পদে থাকা ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্যতার বিধান রয়েছে। এ কারণে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রার্থিতা নিয়ে আইনি ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়া হতে পারে।
ভোট শুরু হতে পারে চলতি মাসেই
ইসি সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে চলতি সপ্তাহেই সার্বিক সিদ্ধান্তে আসতে পারে কমিশন। ইউনিয়ন পরিষদসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন কবে শুরু হবে এবং কোন ধাপে ভোট আয়োজন করা হবে—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
মাঠপর্যায়ে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের তালিকাও ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করেছে ইসি। প্রতিটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অন্তত ২৫ দিন আগে ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করা হবে।
৩১ জুলাই পর্যন্ত নতুন ভোটার হওয়ার সুযোগ দেওয়ার পর ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪০৩ জন। এতে দেশে মোট ভোটার দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ৬৬৫, নারী ৬ কোটি ৩২ লাখ ৬৫ হাজার ৭১১ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৬৭ জন। এসব নতুন ভোটারও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
ভোটার এলাকা স্থানান্তরের আবেদনের সময় শেষ হয়েছে ৭ সেপ্টেম্বর এবং তা নিষ্পত্তির শেষ সময় ছিল ১০ সেপ্টেম্বর। এখন ভোটার তালিকা মুদ্রণের প্রক্রিয়ায় যাওয়ার কথা জানিয়েছে ইসি সূত্র।
আইন ও বিধিতে আসছে একাধিক পরিবর্তন
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আইন ও বিধিতে বেশ কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো আসনে একক প্রার্থী থাকলে ‘না’ ভোটের বিধান চালু হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সংশোধনীতে তা রাখা হয়নি।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগও বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন।
হলফনামায় নতুন তথ্য যুক্ত করা, অসত্য তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিল, দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের অযোগ্য করা এবং নির্বাচনি অপরাধে শাস্তি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে নির্বাচন বন্ধ করার ক্ষমতাও ইসির হাতে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
চূড়ান্ত প্রস্তাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে কেউ অন্য দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকরিতে থাকা অবস্থায় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না রাখার প্রস্তাবও রয়েছে। ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জমা পড়েছে—এমন ব্যক্তিদেরও অযোগ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দলীয় প্রতীক থাকছে না
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তবে স্থানীয়ভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থিত বা নির্দিষ্ট প্রার্থী থাকতে পারেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
তার মতে, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও কোনো প্রার্থী কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত, তা স্থানীয় ভোটারদের কাছে পরিচিত হতে পারে। তবে এতে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার ওপর প্রভাব পড়বে না।
এদিকে আচরণবিধি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরও ক্ষমতা দেওয়ার চিন্তা করছে ইসি। তপশিল ঘোষণার পর প্রার্থী, সমর্থক ও ভোটারদের আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করতে মাঠে যাবেন নির্বাচন কমিশনাররা।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। তপশিল ঘোষণার পর প্রয়োজনে কমিশনাররা মাঠপর্যায়ে যাবেন।