চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই বৈদেশিক লেনদেনে চাপের চিত্র সামনে এসেছে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে রপ্তানি আয়। এতে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি এক বছরের ব্যবধানে ৩৮ শতাংশের বেশি বেড়ে ২০৯ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে আর্থিক হিসাবেও ঘাটতি থাকায় মাস শেষে দেশের সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্য বা ব্যালান্স অব পেমেন্টে (বিওপি) ৬৩ কোটি ডলারের ঘাটতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাইভিত্তিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে দেশে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৬৪৪ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই মাসে আমদানি ব্যয় ছিল ৫৯৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৫১ কোটি ডলার বা ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে, জুলাইয়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৩৫ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই মাসের ৪৪২ কোটি ডলারের তুলনায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কম।
আমদানি বাড়া ও রপ্তানি কমার এই দ্বিমুখী চাপে জুলাইয়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০৯ কোটি ডলারে। গত অর্থবছরের একই মাসে এ ঘাটতি ছিল প্রায় ১৫১ কোটি ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৫৮ কোটি ডলার বা ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থবছরের শুরুতেই এমন পরিস্থিতি বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
তবে বাণিজ্য ঘাটতির ধাক্কা সামলাতে কিছুটা সহায়তা করেছে প্রবাসী আয়। জুলাইয়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২৮৬ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৫ দশমিক ৪-১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্সের এই শক্তিশালী প্রবাহের কারণে বাণিজ্য ঘাটতি সত্ত্বেও জুলাই শেষে চলতি হিসাবে ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ধরে রাখতে পেরেছে বাংলাদেশ। যদিও গত বছরের একই সময়ে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত ছিল সাড়ে ১২ কোটি ডলার। অর্থাৎ উদ্বৃত্ত থাকলেও এর পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।
অন্যদিকে, আর্থিক হিসাবেও স্বস্তির চিত্র নেই। জুলাইয়ে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৮ কোটি ডলার। গত অর্থবছরের একই মাসে এ ঘাটতি ছিল ৮৮ কোটি ডলার। ঘাটতি কমলেও বিদেশি অর্থপ্রবাহের পরিস্থিতি এখনও দুর্বল। অর্থবছরের প্রথম মাসে বিদেশি ঋণ ও অনুদানের প্রবাহ কমেছে। পাশাপাশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগও (এফডিআই) কমেছে। জুলাইয়ে এফডিআই এসেছে ১১ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১ কোটি ডলার কম।
সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে দেশের সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ৬৩ কোটি ডলারের ঘাটতি হয়েছে। গত অর্থবছরের জুলাইয়ে এ ঘাটতি ছিল ৫৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ চলতি হিসাব রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে উদ্বৃত্ত থাকলেও বাণিজ্য ও আর্থিক হিসাবের চাপ সামগ্রিক বিওপিকে ঘাটতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থবছরের শুরুতেই রপ্তানি কমে যাওয়া এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া অর্থনীতির বৈদেশিক ভারসাম্যের জন্য সতর্ক সংকেত। রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি সাময়িকভাবে চাপ কমালেও শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ধরে রাখা সম্ভব নয়। রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আমদানির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য আনা জরুরি। অর্থবছরের পরবর্তী মাসগুলোতে এই সমন্বয় করতে না পারলে বাণিজ্য ঘাটতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।