নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনটি ছিল আট বছর বয়সি ফিলিস্তিনি শিশু ওয়াফা ইউসুফ নাবিল আকিলার জন্য আনন্দের। নীল স্কুল ইউনিফর্ম পরে হাসিমুখে স্কুলে যাওয়ার ছবিও ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই শিশুটিই প্রাণ হারাল গাজায় একটি হামলায়।
‘দ্য মিডল ইস্ট আই’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার (৮ সেপ্টেম্বর) গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলে বাবার সঙ্গে গাড়িতে থাকা অবস্থায় ওয়াফা নিহত হয়। হামলায় তার বাবা ইউসুফ নাবিল রাবাহ আকিলাও মারা যান।
আল-শিফা হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, হামিদ মোড়ের কাছে একটি ইসরাইলি ড্রোন থেকে গাড়িটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এতে বাবা-মেয়ের মৃত্যু ছাড়াও আরও ছয়জন আহত হন।
হামলার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে ওয়াফাকে নতুন স্কুলের পোশাকে উচ্ছ্বসিত দেখা যায়। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাম্বস-আপ দেখিয়ে নতুন শিক্ষাবর্ষের আনন্দও প্রকাশ করেছিল সে।
কিন্তু হামলার পরের দৃশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ির ধ্বংসাবশেষের আশপাশে পড়ে থাকতে দেখা যায় শিশুটির বই, খাতা ও অন্যান্য শিক্ষা সামগ্রী।
ঘটনার পর ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। তাদের প্রশ্ন, যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও গাজায় বেসামরিক মানুষ ও শিশুদের মৃত্যু কেন বন্ধ হচ্ছে না।
হামলার পর ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্রথমে জানায়, হামাসের এক সদস্যকে লক্ষ্য করেই ওই অভিযান চালানো হয়েছিল। ঘটনার বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়।
পরদিন সোমবার এক বিবৃতিতে ইসরাইলি সেনাবাহিনী দাবি করে, হামলায় নিহত ইউসুফ আকিলা হামাসের নুখবা বাহিনীর একজন কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন। তাদের আরও দাবি, তিনি ইসরাইলি সেনা ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং হামাসের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনে কাজ করছিলেন।
তবে এসব দাবির সমর্থনে প্রকাশ্য কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
গাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে চলতি মাসের শেষ দিকে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর কথা থাকলেও কিছু স্কুল ও বিকল্প শিক্ষা কেন্দ্র এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে।
দীর্ঘ সংঘাতে উপত্যকার বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে এখন তাঁবু, অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ কিংবা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত ভবনে পড়াশোনা করতে হচ্ছে।
এর মধ্যেই স্কুলে ফেরার প্রথম দিনেই ওয়াফার মৃত্যু গাজার শিশুদের নিরাপত্তা ও শিক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ওয়াফার মৃত্যুর পাশাপাশি একই দিনে গাজার বিভিন্ন এলাকায় আরও কয়েকজন শিশু ও তরুণ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহর পূর্বাঞ্চলে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত সাকিনা স্কুলে গোলাবর্ষণে সাত বছর বয়সি সাদি ঘালিয়া নিহত হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া গাজা সিটির রিমাল এলাকায় ড্রোন হামলায় ২৮ বছর বয়সি মোহাম্মদ আতেফ আরাফাত সুক্কার নিহত হন। অন্যদিকে ফিলিস্তিন স্টেডিয়াম ও আল-মামুনিয়া স্কুলের কাছে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত ১৯ বছর বয়সি হাসান আলি সাকাল্লাহ পরে মারা যান বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
ওয়াফার মৃত্যু আবারও দেখিয়ে দিল, দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যে গাজার শিশুদের জন্য স্কুলে ফেরাও কতটা অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।