সারের দাবিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও গুদামে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। গত তিন দিনে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঝিনাইদহ ও রাজশাহীতে সার না পাওয়া, দেরিতে বিতরণ, ডিলারদের অনিয়ম এবং বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগে মাঠে নামেন কৃষকরা। কোথাও গুদামের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, কোথাও মহাসড়ক অবরোধ, আবার কোথাও ডিলারের গুদামে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। অথচ সরকারের দাবি, দেশে সারের কোনো সংকট নেই। কৃষি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বলেন, সরকারি গুদাম ও ওয়্যারহাউসে প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন সার মজুদ আছে। এর আগে ২৯ আগস্ট ফরিদপুরে তিনি বলেছিলেন, দেশে সারের ঘাটতি নেই, একটি চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। সরকারের এই বক্তব্যের মধ্যেই মাঠের চিত্র ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।
গতকাল সোমবার কুড়িগ্রামের রৌমারীর বন্দবেড় বাজারে সার নিতে ভোর থেকে অপেক্ষা করেন কৃষকরা। বিতরণে দেরি হওয়ায় একপর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভাঙচুর করে কৃষকেরা ভেতরে ঢোকেন। ডিলারের দাবি, গুদাম থেকে প্রায় ১৫০ বস্তা ইউরিয়া নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বসুনিয়া এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার ভিডিওটি ভুয়া এবং বন্দবেড়ে এমন ঘটনা ঘটেনি। একই দিন জেলার ভূরুঙ্গামারীতে চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগে সড়ক অবরোধ করেন কৃষকেরা। একপর্যায়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে কিছু সময় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এর আগেও ৬ সেপ্টেম্বর নাগেশ্বরীর কচাকাটা বাজারে ডিলারের লোকজনের জন্য প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর কৃষকেরা উত্তেজিত হয়ে গুদামের টিনের বেড়া ভাঙচুর করেন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং তাদের উপস্থিতিতে সার বিতরণ করা হয়। অর্থাৎ একই জেলায় একাধিক উপজেলায় একই সময়ে সার বিতরণ নিয়ে কৃষকদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে এসেছে।
গতকাল রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর বাজার এলাকায় সারের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করেন কৃষকেরা। সকাল ১০টার দিকে প্রায় ৩০০ কৃষক রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কে অবস্থান নেন। প্রায় এক ঘণ্টা অবরোধের কারণে সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে এবং দুই পাশে যানজট তৈরি হয়।
কৃষকদের অভিযোগ, রোপা আমন মৌসুমে সার প্রয়োগের সময় হলেও স্থানীয় ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের আরও অভিযোগ, খোলা বাজারে বেশি দামে সার বিক্রির জন্য কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। তাঁরা চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ এবং সরকারি নির্ধারিত দামে সার বিক্রির দাবি জানান।
লালমনিরহাটে মহাসড়ক অবরোধ : ৬ সেপ্টেম্বর লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগরে বাফা গুদামের সামনে গাছের গুঁড়ি ফেলে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক অবরোধ করেন কৃষকেরা। তাঁদের অভিযোগ, আমন মৌসুমে প্রয়োজনের সময়ে ডিলারদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সার পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে সার ব্যবসার সিন্ডিকেট বন্ধের দাবি জানান।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে সারের চাহিদা ধরা হয়েছে ৬৭ দশমিক ৭ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৬ দশমিক ২ লাখ, ডিএপি ১৩ দশমিক ৫ লাখ, এমওপি ৯ দশমিক ৭ লাখ এবং টিএসপি ৯ দশমিক ০১ লাখ মেট্রিক টন। এই হিসাবে জাতীয় পর্যায়ে মজুদ থাকা আর ইউনিয়ন পর্যায়ের ডিলার পয়েন্টে কৃষকের হাতে সময়মতো সার পৌঁছানো এক বিষয় নয়। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে যে জায়গাটি বারবার সামনে আসছে, সেটি হলো বিতরণ ব্যবস্থা, ডিলার পর্যায়ের সরবরাহ, বরাদ্দের সঙ্গে স্থানীয় চাহিদার মিল এবং নির্ধারিত দামে সার বিক্রি হচ্ছে কি না-এই চারটি বিষয়।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ যেখানে বলছেন, দেশে সার আছে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেখানে একের পর এক এলাকায় কৃষকদের সড়কে নামা এবং গুদাম ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হওয়া প্রশাসনের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থার পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রশ্ন মজুত কত, তার পাশাপাশি মাঠে কৃষকের কাছে কতটা সার, কোন দামে এবং কত সময়ে পৌঁছাচ্ছে-সেই হিসাবও প্রকাশ করা।