দীর্ঘ অপেক্ষার পর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নভেম্বর থেকে ধাপে ধাপে ভোটগ্রহণ শুরুর পরিকল্পনা করছে কমিশন। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য নতুন আচরণবিধিও জারি করা হয়েছে। এতে পোস্টার নিষিদ্ধের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, ইউপি নির্বাচন উপজেলাভিত্তিক আয়োজন করা হবে। অর্থাৎ একটি উপজেলার অধীনে যতগুলো ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে, সেগুলোর নির্বাচন একই ধাপে করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে ইউপি নির্বাচন মোট কয় ধাপে হবে—পাঁচ নাকি ছয় ধাপে—তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি। তফসিল ঘোষণার বিষয়টি কমিশনের এখতিয়ার বলেও উল্লেখ করেন ইসি সচিব।
উপজেলাভিত্তিক হবে ইউপি ভোট
ইসি সচিব বলেন, একটি উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের ভোট এক ধাপে এবং বাকি ইউনিয়নগুলোর ভোট অন্য ধাপে করা হলে প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এ কারণে একই উপজেলার সব ইউনিয়নে একই সময়ে ভোট নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এর আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরে তফসিল দিয়ে নভেম্বরে ইউপি নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ, ৩৩০ পৌরসভা, পাঁচ শতাধিক উপজেলা, ৬১ জেলা পরিষদ ও ১৩টি সিটি করপোরেশন রয়েছে। এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি।
এরপর পর্যায়ক্রমে অন্য স্থানীয় নির্বাচন
ইসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউপি নির্বাচনের পর পর্যায়ক্রমে সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে আয়োজন করা হবে।
তবে ভোটের সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা, ধর্মীয় ও জাতীয় বিভিন্ন কর্মসূচিসহ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করবে কমিশন। কারণ ভোটকেন্দ্র হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবহার এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও এর সঙ্গে জড়িত।
স্থানীয় নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে রোববার রাতে পৃথক পৃথক আচরণবিধির গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য আলাদা আচরণবিধি করা হলেও বিধানগুলো অনেকটাই অভিন্ন।
নতুন আচরণবিধিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে প্রচারণায় ব্যানার, ফেস্টুন, হ্যান্ডবিল ও বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এসব প্রচারসামগ্রীর আকার ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধান দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, তবে নজরদারি থাকবে
প্রার্থীরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাতে পারবেন। তবে অনলাইন প্রচারণার আগে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের আইডি ও ই-মেইল ঠিকানা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। প্রচারণার ব্যয়ের হিসাবও জানাতে হবে।
এআই ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো, ভুয়া তথ্য প্রচার, প্রতিপক্ষের চরিত্র হনন কিংবা ঘৃণাত্মক বক্তব্য ছড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রতীক বরাদ্দের আগে প্রচার নয়
আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রতীক বরাদ্দের আগে কোনো প্রার্থী প্রচারণা চালাতে পারবেন না। জনসভা ও মিছিলের ওপরও বিধিনিষেধ থাকছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় প্রার্থীর সঙ্গে সর্বোচ্চ পাঁচজন সমর্থক থাকতে পারবেন।
এ ছাড়া ভোটার বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত এনআইডি নম্বর সংগ্রহ করে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা যাবে না। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে লেনদেনের উদ্দেশ্যেও ভোটারদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, চিফ হুইপ, হুইপ, সংসদ সদস্যসহ নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের মেয়র বা মেয়রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কিংবা প্রশাসকরাও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না।
প্রার্থী ছাড়া চেয়ারম্যান, মেয়র, প্রশাসক বা স্থানীয় সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রচারণায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
আচরণবিধি ভাঙলে শাস্তি
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুরুতর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করতে পারবে।
সব মিলিয়ে ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছেছে নির্বাচন কমিশন। সেপ্টেম্বরে তফসিল, নভেম্বরে ভোট, উপজেলাভিত্তিক নির্বাচন এবং পোস্টারবিহীন প্রচারণা—এই চারটি বিষয় এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হতে যাচ্ছে।