রিটার্নে এক রকম আয়, ব্যাংক হিসাবে কোটি টাকার লেনদেন; সঙ্গে দামি গাড়ি, জমি-ফ্ল্যাট কেনা কিংবা ঘনঘন বিদেশ ভ্রমণ—এ ধরনের অসঙ্গতি আর সহজে আড়ালে থাকবে না। করদাতার ঘোষিত আয়, বাস্তব ব্যয় ও অর্জিত সম্পদের মধ্যে গরমিল খুঁজে বের করতে ডেটাভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন ব্যবস্থায় বিভিন্ন উৎসের তথ্য এক জায়গায় এনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেখা হবে। বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট করদাতাকে উচ্চঝুঁকির তালিকায় রেখে ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা ও কর নির্ধারণের আওতায় আনা হবে।
এনবিআরের পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘ন্যাশনাল ইনকাম ট্যাক্স ডাটা ম্যাচিং সিস্টেম’। এর আওতায় আয়কর রিটার্নে ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে ব্যাংক হিসাব ও বড় লেনদেন, ক্রেডিট কার্ড ব্যয়, জমি-ফ্ল্যাট কেনাবেচা, গাড়ির মালিকানা, আমদানি-রপ্তানি, বিদেশ ভ্রমণ, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, উচ্চমূল্যের ইউটিলিটি সংযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় ব্যয়সহ বিভিন্ন তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেখা হবে।
এনবিআর একটি উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছে, কোনো করদাতা বছরে ১২ লাখ টাকা আয় ঘোষণা করলেন, অথচ তাঁর ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। একই সময়ে তিনি ৫০ লাখ টাকার গাড়ি ও ১ কোটি টাকার জমি কিনেছেন এবং বছরে পাঁচবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। এমন ক্ষেত্রে ঘোষিত আয়, ব্যয় ও সম্পদের মধ্যে বড় অসামঞ্জস্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় ধরা পড়বে এবং সম্ভাব্য কর ফাঁকির বিষয়টি সামনে আসবে।
শুধু ব্যক্তিগত করদাতাই নয়, উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের জন্যও পৃথক প্রোফাইল তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে রিটার্নে দেখানো আয়ের পাশাপাশি সম্পদ বৃদ্ধির হার, জীবনযাপনের ব্যয় ও আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে প্রদত্ত করের সামঞ্জস্য বিশ্লেষণ করা হবে। ঘোষিত আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির মধ্যে বড় পার্থক্য পাওয়া গেলে তাঁদের উচ্চঝুঁকির শ্রেণিতে নিয়ে নিরীক্ষার আওতায় আনা হতে পারে।
করপোরেট পর্যায়েও একই ধরনের ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি চালুর পরিকল্পনা করেছে এনবিআর। কোম্পানির মোট লেনদেনের বিপরীতে ঘোষিত মুনাফা, গ্রস প্রফিট রেশিও, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেন, সুদ, ব্যবস্থাপনা ফি, রয়্যালটি, কমিশন, অবচয়, মন্দঋণ ও পরিচালকদের সম্মানীসহ বিভিন্ন আর্থিক সূচক বিশ্লেষণ করা হবে। আমদানিপণ্যের ঘোষিত মূল্য, স্থানীয় বাজারে বিক্রি এবং ভ্যাট ও আয়কর রিটার্নে দেখানো লেনদেনের মধ্যেও গরমিল খোঁজা হবে।
এর পাশাপাশি টিআইএন ডাটাবেজ পরিশোধন করে করদাতাদের কার্যক্রম অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস করা হবে। নিয়মিত রিটার্ন ও কর দেওয়া ব্যক্তিদের ‘অ্যাকটিভ ট্যাক্সপেয়ার’, রিটার্ন দিলেও করযোগ্য আয় না থাকা ব্যক্তিদের ‘রিটার্ন ফাইলার বাট নো ট্যাক্স’, টিআইএন থাকলেও রিটার্ন না দেওয়া ব্যক্তিদের ‘নন-ফাইলার’ এবং দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় টিআইএনকে ‘ডরম্যান্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। টিআইএন না থাকলেও করযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদেরও ‘পটেনশিয়াল ট্যাক্সপেয়ার’ হিসেবে শনাক্ত করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী তিন মাসের মধ্যে টিআইএন ডাটাবেজ পরিশোধন ও শ্রেণিবিন্যাসের কাজ শুরু হবে। ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি, যানবাহন ও কোম্পানিসংক্রান্ত তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংযুক্ত করে স্বয়ংক্রিয় আয়-সম্পদ প্রোফাইল তৈরির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার কথা রয়েছে। এক থেকে দুই বছরের মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট ও স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। আর দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট, তৃতীয় পক্ষের তথ্যের পূর্ণাঙ্গ ক্রস-ম্যাচিং এবং শক্তিশালী আয়কর ডেটা ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনবিআর।
এ উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু কর ফাঁকি শনাক্ত করা নয়, করভিত্তি সম্প্রসারণ ও কর প্রশাসনকে প্রযুক্তিনির্ভর করা। এনবিআরের কর্মপরিকল্পনায় কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমান ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে স্বল্পমেয়াদে আরও ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়ে মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকার আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি।
রাজস্ব বাড়াতে বিদেশেও নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বাণিজ্যিক জালিয়াতি, রাজস্ব ফাঁকি ও বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থপাচার ঠেকাতে প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোতে বাংলাদেশের মিশনে ‘কাস্টমস অ্যাটাশে’ নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা ও বিভাগীয় শহরে সম্পত্তিভিত্তিক আয়কর পরিপালন কর্মসূচি, বকেয়া কর আদায়ে নতুন ডেটা ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা এবং করদাতা ও কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ কমাতে ফেসলেস অডিট ও অ্যাসেসমেন্ট চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ভোরের ডাককে বলেন, এ ধরনের প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় থাকলেও কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে থাকা বাংলাদেশের জন্য করভিত্তি সম্প্রসারণ ও কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।