রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর-টঙ্গী সড়কে মধ্যরাতে মোটরসাইকেলের দুই আরোহীর মাঝে এক তরুণীকে অনেকটা নিস্তেজ অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ভিডিও দেখে অনেকে তাঁকে মৃত বা গুরুতর অসুস্থ বলে ধারণা করেছিলেন।
তবে শনিবার (২৯ আগস্ট) টঙ্গী পশ্চিম থানায় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওই তরুণী দাবি করেছেন, তিনি নিজেই মদ পান করেছিলেন এবং পরে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
তরুণী বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি নিজেই মদ খেয়েছি। কেউ তো খাওয়ায় দেয় নাই। ওই লোকগুলো (বাইকের) আসছে আমাকে সাহায্য করতে।’
পুলিশ জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে তাঁর বোনের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওতে থাকা মোটরসাইকেলের দুই আরোহীকে শনাক্ত করে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা চলছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অপরাধ (উত্তর) বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, পারিবারিকভাবে বিভিন্ন সমস্যায় মানসিক চাপে ছিল। সে নিজ বাড়িতে গিয়ে মদ পান করে।’
পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য, পরে মদ্যপ অবস্থায় ওই তরুণী দুই যুবকের সঙ্গে যান। তাঁদের শনাক্ত করা গেলে ঘটনার বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।
জিজ্ঞাসাবাদে তরুণী দাবি করেন, মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তিকে তিনি চাচা হিসেবে চিনতেন। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁদের ফোন করেন। তাঁর ফোন পেয়ে ওই দুই ব্যক্তি এসে তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে যান বলে দাবি করেন তিনি।
তরুণী বর্তমানে টঙ্গীতে থাকেন বলেও জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তাঁর একাধিক বিয়ের তথ্যও তিনি অস্বীকার করেছেন।
তাঁর দাবি, সাবেক স্বামী শাহরিয়ার তাঁকে বিপদে ফেলতে বিভিন্ন মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন। এসব কারণে তিনি মানসিকভাবে অশান্তিতে ছিলেন বলেও দাবি করেন।
কীভাবে শুরু হয় রহস্য
এর আগে বুধবার (২৬ আগস্ট) রাত আনুমানিক ৩টা ১৫ থেকে ৩টা ২০ মিনিটের দিকে আব্দুল্লাহপুর-টঙ্গী সড়কে মোটরসাইকেলের মাঝখানে ওই তরুণীকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা যায়।
ওমরাহ সফর শেষে বগুড়ায় ফেরার পথে মুফতি মনোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত মোটরসাইকেলটিকে অনুসরণ করেন বলে জানা গেছে।
তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, মোটরসাইকেল চালকের পেছনে বসা এক যুবক তরুণীকে জাপটে ধরে রেখেছিলেন। তরুণীর দুই পা খালি ছিল এবং অস্বাভাবিকভাবে ঝুলছিল। এতে তিনি ধারণা করেন, তরুণী হয়তো অচেতন অবস্থায় ছিলেন।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে নানা ধরনের দাবি ও জল্পনা শুরু হয়। তবে সেসব দাবির সবকটির সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
ঘটনার পর মোটরসাইকেলটির নম্বর শনাক্ত করে এর মালিকানা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে পুলিশ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মোটরসাইকেলটির মালিকের বাড়ি কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাহপুর এলাকায়। মোটরসাইকেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক মোবাইল নম্বরের তথ্যও পাওয়া যায়। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও এসব তথ্যের সবকিছু এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মোটরসাইকেলের চালকের বাড়ি রাজেন্দ্রপুর এলাকায় বলে জানা গেছে। তাঁর নামের শেষাংশ ‘আলম’ বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
পরিবারের সদস্যের ভিন্ন দাবি
ওই তরুণীর বড় বোনের স্বামী দাবি করেন, তিনি আগে কখনো মদ পান করতেন না। পারিবারিক বিরোধের পর তিনি বাসা থেকে বেরিয়ে যান। পরে এক যুবকের সঙ্গে মদ পান করার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে তাঁর ধারণা।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অসুস্থ হওয়ার পর আলম ও তাঁর এক বন্ধু তরুণীকে নিয়ে টঙ্গীতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তাঁরা মিরপুরে ফিরে গিয়ে এক বান্ধবীর বাসায় তাঁকে রেখে দেন এবং পরিবারের সদস্যদের খবর দেন।
তবে এসব তথ্যের সবকটি এখনো পুলিশের তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।
ওই তরুণীর সাবেক এক স্বামীও তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তদন্তে মিলবে কি আসল রহস্য?
এর আগে ভিডিওতে তরুণীকে অচেতন বা নিথর অবস্থায় দেখা গেলেও বর্তমানে তিনি সুস্থ রয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে বোনের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
এখন পুলিশের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেলে থাকা দুই যুবকের বক্তব্য। তাঁদের শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে ওই রাতে তরুণী কোথা থেকে মোটরসাইকেলে উঠেছিলেন, কেন তাঁকে ওই অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল এবং পুরো ঘটনার পেছনে আসলে কী ঘটেছিল—তা আরও পরিষ্কার হতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, মোটরসাইকেলের মালিকানা, ভিডিওর উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত কারণ বের করার চেষ্টা চলছে।