সাধারণত সভা-সমাবেশ, মিছিল কিংবা নির্বাচনের মাঠে রাজনীতিবিদদের শৃঙ্খলা কিংবা সুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যাওয়ার কথা। তবে সম্পতিকালে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচীতে সেই সুস্থ প্রতিযোগিতা রূপ নিচ্ছে অনাকাঙ্খিত হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কিতে। এমনকি দলের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ কর্মসূচীতেও দেখা গেছে এমন চিত্র। কবরের সামনে কয়েক হাত জায়গা যেন হয়ে উঠছে ক্ষমতার মাপকাঠি। আর যদি এসব কর্মসূচীর সামনে কোনো ক্যামেরা দেখা গেলে মুহুর্তেই ভেঙ্গে যায় নেতাকর্মীদের ‘চেইন অব কমান্ড’, হুড়োহুড়ি বেড়ে আহতও হন অনেকে। নেতাকর্মীদের এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি বিব্রত হচ্ছেন দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরাম তথা স্থায়ী কমিটিসহ শীর্ষপর্যায়ের জ্যেষ্ঠ নেতারা।
সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে দলীয় প্রতিষ্ঠাতার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে চরম বিশৃঙ্খলার মুখে পড়েন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নেতাকর্মী ও অনুসারীদের প্রচণ্ড ভিড় ও গায়ের ওপর গায়ের চাপের কারণে লাঠিতে ভর দিয়ে চলা অসুস্থ এই শীর্ষ নেতা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হন। তীব্র গরম ও ধাক্কাধাক্কির কারণে সেখানে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সামনের সারির নেতাদের সহায়তায় কোনোমতে তিনি শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষ করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রিজভী বলেন, দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশিত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও দলকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর জাতীয় দিবস, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কিংবা কেন্দ্রীয় কর্মসূচীতে এই হুড়োহুড়ি এখন একরকম নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের নবগঠিত কমিটির উদ্যোগে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বিশৃঙ্খল ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়েন ঢাকা-৬ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ভিডিও ভাইরাল হলে তিনি নিজ থেকেই ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য তাকে কঠোর হতে হয়েছিল বলে ব্যাখ্যা দেন। এছাড়া জাতীয়তাবাদী মহিলা দলসহ নানা অঙ্গসংগঠনের কর্মসূচীতেও প্রায়শই এমন বিশৃঙ্খল চিত্র ফুটে ওঠে।
গতকাল শুক্রবার স্যোসাল মিডিয়া একটিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য তার নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে একটি ছবি পোস্ট করে লিখেন, “রিজভী ভাই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার পরে গেসেন জিয়ার মাজারে। সেই রিজভী ভাইয়ের অবস্থা দেখেন। অনেকে মোনাজাতের জন্য দুই হাত ও তুলতে পারে নাই। তাও ভাগ্য ভালো ইশরাক আসে নাই এইখানে। তাইলে খবর আছিলো সবার। বেচারা রিজভী ভাই।”
এদিকে এসব বিশৃঙ্খলার মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে অতিরিক্ত জনসমাগম, নির্দিষ্ট লাইনে না দাঁড়িয়ে আগে ফুল দেওয়ার তাড়া এবং ক্যামেরার সামনে নিজেদের চেহারা দেখিয়ে শীর্ষ নেতাদের কাছাকাছি থাকার প্রতিযোগিতা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় এটি শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, যেন নিজের উপস্থিতি জাহিরের এক অঘোষিত মহড়া। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা কৌতুক ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে দলটিকে, যা শেষ পর্যন্ত দলীয় ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। নেতাকর্মীদের এমন আচরণে বারবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা। দলটির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার কর্মসূচীতে নেতাকর্মীদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেও শেষ পর্যন্ত ফেরেনি শৃঙ্খলা।
বিষয়টি নিয়ে চরম হতাশা ব্যক্ত করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান জানান, এ ধরনের দৃশ্য সত্যিই অত্যন্ত বিব্রতকর। রাজনীতি কেবল ফ্রেমে নাম ওঠানো বা স্লোগান দেওয়ার বিষয় নয়, এর পেছনের দর্শন উপলব্ধি করা জরুরি। শৃঙ্খলা ফেরাতে দরকার পড়লে কর্মীদের জন্য সাংগঠনিক প্রশিক্ষণের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে দলটির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এর জন্য গণমাধ্যমের অতিরিক্ত ক্যামেরা এবং মধ্যম সারির নেতাদের অসংযত আচরণকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, রাজনীতিতে জ্যেষ্ঠ ও জুনিয়রদের পদমর্যাদার শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের লজ্জাজনক পরিস্থিতি বারবার ফিরে আসবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলীয় প্রতিষ্ঠাতার সমাধিতে ফুল দেওয়ার পবিত্র মুহূর্তগুলোতে যদি সংযম ও শৃঙ্খলা না থাকে, তবে তা দলীয় ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন করে। শৃঙ্খলার রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে।