রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীতে স্পা সেন্টারের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মাদক কারবারের অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। সম্প্রতি কয়েকটি স্পা সেন্টারে ধারাবাহিক অভিযানে শতাধিক নারী-পুরুষ গ্রেপ্তারের পর সামনে এসেছে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুলশান-১, গুলশান-২ ও বনানীর বিভিন্ন ভবনে অর্ধশতাধিক স্পা সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত স্পা সেবার আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সবকটির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বাইরে স্পা, ভেতরে কী?
স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক স্পা সেন্টারের বাইরে নেই কোনো সাইনবোর্ড। সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতোই ভবনের ভেতরে চলছে কার্যক্রম। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, সেখানে কী ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে।
কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, মাঝেমধ্যে অভিযান হলেও কিছুদিন পর আবারও কার্যক্রম শুরু হয়।
অনলাইনেই চলছে প্রচারণা
অনুসন্ধানে একটি স্পা সেন্টারের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন ধরনের ম্যাসাজ ও থেরাপির প্রচারণা পাওয়া গেছে। সেখানে থাই, সুইডিশ, ডিপ টিস্যু, হট অয়েল, ড্রাই, ফুল বডি ও হট স্টোনসহ বিভিন্ন সেবার তালিকা দেওয়া হয়েছে।
সেবাভেদে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্য নির্ধারণের তথ্যও রয়েছে ওয়েবসাইটে।
তবে স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, অনলাইনের প্রচারণার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় ভিজিটিং কার্ড বিতরণ এবং মোবাইল ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ করা হয়।
গ্রাহক সংগ্রহে এজেন্ট!
সংশ্লিষ্টদের দাবি, কিছু স্পা সেন্টারের সঙ্গে একাধিক এজেন্ট যুক্ত রয়েছেন। তারা সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসেন।
অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মুঠোফোনে নারী কর্মীদের ছবি দেখিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করা হয়। পরে সেবা ও অর্থের বিষয়ে দরদাম করা হয়।
ঘণ্টায় হাজার হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, কিছু স্পা সেন্টারে কথিত ‘বিশেষ সেবা’র জন্য ঘণ্টাভিত্তিক অর্থ নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সেবাভেদে কয়েক হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়ে থাকে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন।
নির্দিষ্ট কয়েকটি স্পা নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ
বনানীর একটি ভবনের সাততলায় পরিচালিত একটি স্পা সেন্টার নিয়েও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। শাওন নামের এক ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বলে তাদের দাবি।
অভিযোগের বিষয়ে শাওনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ব্যস্ত থাকার কথা জানিয়ে ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
গুলশান-২-এর একটি স্পা সেন্টার নিয়েও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। রত্না নামের এক নারী এটি পরিচালনা করেন বলে দাবি স্থানীয়দের। অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্পা পরিচালনার কথা স্বীকার করেন।
এ ছাড়া বনানী কবরস্থানের বিপরীত পাশের একটি স্পা সেন্টার নিয়েও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। শহীদ নামের এক ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বলে তাদের দাবি। তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন কেটে দেন এবং পরে আর সাড়া দেননি।
পুলিশের ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও বাসিন্দার অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হয়।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে তারা সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযানে গ্রেপ্তার শতাধিক
সাম্প্রতিক সময়ে গুলশান ও বনানীর কয়েকটি স্পা সেন্টারে অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গুলশান-২-এর একটি স্পা সেন্টারে ডিবির গুলশান বিভাগ অভিযান চালিয়ে ১৯ নারী ও তিন পুরুষসহ ২২ জনকে গ্রেপ্তার করে।
এ ছাড়া গুলশান থানা পুলিশের পৃথক অভিযানে বিভিন্ন স্পা সেন্টার থেকে ২৯ নারী ও ২৪ পুরুষসহ আরও ৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন এবং অসামাজিক কার্যকলাপ নিরোধ আইনে মামলা করা হয়েছে।
‘অবৈধ স্পার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, অভিজাত আবাসিক এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অবৈধ স্পা সেন্টারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।
গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় স্পা ব্যবসার আড়ালে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড চলছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
প্রতিবেদনটি বাংলা ট্রিবিউনের সহযোগিতায়