আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম করে হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্য দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নিজাম উদ্দিন হাওলাদার।
রবিবার (২৩ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেওয়ার সময় তিনি ২০১০ সালে বাগেরহাটের শরণখোলায় একটি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন।
সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ২০১০ সালের ১৭ মে তিনি শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই দিন বিকেলে থানার এক চৌকিদার ফোন করে বলেশ্বর নদীর পশ্চিম তীরে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ পড়ে থাকার খবর দেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, লাশটির শরীরে জমাট বাঁধা সিমেন্টের বস্তা বাঁধা ছিল। লাশটি পচে গিয়েছিল। পেট কাটা, মাথা কাপড় দিয়ে ঢাকা এবং হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ছিল।
খবর পেয়ে থানার এসআই ইকবালকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। তিনি লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য বাগেরহাট সদর হাসপাতালে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। তবে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় সেদিন লাশটি থানায় নিয়ে আসা হয়। পরদিন সকালে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়।
নিজাম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, অজ্ঞাতনামা হওয়ায় ময়নাতদন্ত শেষে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি বাগেরহাটে দাফন করা হয়।
এর কয়েক দিন পর এক ব্যক্তি থানায় ফোন করে দাবি করেন, উদ্ধার হওয়া লাশটি তাঁর ভাইয়ের। তিনি জানান, প্রায় দুই থেকে তিন মাস আগে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া থেকে তাঁর ভাই নিখোঁজ হন এবং এ ঘটনায় সেখানে অপহরণ মামলা করা হয়েছে।
পরে ওই ব্যক্তির দুই ভাই, স্ত্রী ও চাচা শরণখোলা থানায় এসে মৃত ব্যক্তির পোশাক দেখে লাশটি শনাক্ত করেন বলে আদালতে জানান সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা। নিহতের স্ত্রীও লাশটি তাঁর স্বামীর বলে দাবি করেন।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, স্বজনদের বলা হয়েছিল ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে লাশ নেওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে।
স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তির নাম নজরুল ইসলাম। তিনি সাবেক বিডিআর সদস্য ছিলেন এবং পিলখানা ঘটনার পর পলাতক অবস্থায় গোপালগঞ্জের একটি ক্লিনিকে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছিলেন বলে আদালতে জানানো হয়।
জবানবন্দিতে নিজাম উদ্দিন হাওলাদার আরও বলেন, ঘটনার কয়েক দিন পর খুলনা বিডিআর সেক্টরের এক কর্নেল ফোন করে লাশটির বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চান। ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।
তিনি জানান, পরে তিনি বদলি হয়ে রামপাল থানায় চলে যান। দায়িত্ব পালনকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের লাশ উদ্ধারের খবরও পত্রিকায় দেখেছেন বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান।
মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলছে। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ এনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরে ১৪ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
জবানবন্দি শেষে জিয়াউল আহসানের আইনজীবীরা সাক্ষীকে জেরা করেন।