গাইবান্ধায় সরকারি বোরো ধান সংগ্রহ অভিযানের নির্ধারিত সময় শেষ হতে এখনো দুই সপ্তাহের বেশি বাকি। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান সংগ্রহের কথা থাকলেও গত ৯ আগস্ট থেকে জেলার খাদ্য বিভাগ ধান কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। এতে সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে না পেরে বাধ্য হয়ে স্থানীয় পাইকারদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করছেন কৃষকরা। অনেকে লোকসানের আশঙ্কায় ধান গোলায় রেখে দিয়েছেন।
বাংলাদেশ কৃষক সমিতির গাইবান্ধা জেলা শাখার সভাপতি সাদেকুল ইসলাম বলেন, জেলার বহু কৃষক পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস ধান। কৃষকের ঘরে এখনো বিপুল পরিমাণ বোরো ধান অবিক্রীত রয়েছে। সরকার প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও স্থানীয় বাজারে মোটা ধান ৮৫০ টাকা এবং চিকন ধান ৯৫০ টাকা মণে বিক্রি হচ্ছে। সরকারি ক্রয় বন্ধ থাকায় কৃষকরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, সরকার অতিরিক্ত ধান কেনার জন্য খাদ্য বিভাগকে নির্দেশ দিলেও গাইবান্ধায় নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই ধান কেনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কৃষকের স্বার্থে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান সংগ্রহ কার্যক্রম চালু রাখার দাবি জানান তিনি।
জেলা খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে গাইবান্ধায় ৯ হাজার ৫৬৩ মেট্রিক টন বোরো ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। গত ৩ মে থেকে সরকারি পর্যায়ে ধান ও চাল সংগ্রহ শুরু হয়। নিয়ম অনুযায়ী এ কার্যক্রম ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলার কথা। তবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি ধান কেনা হয়েছে উল্লেখ করে ৯ আগস্ট থেকে ধান সংগ্রহ বন্ধ করে দেয় খাদ্য বিভাগ।
খাদ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১১টি খাদ্যগুদামে ধান ও চাল সংরক্ষণের মোট ধারণক্ষমতা ৪৩ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমানে এসব গুদামে প্রায় ৩৯ হাজার মেট্রিক টন ধান ও চাল মজুদ রয়েছে। অর্থাৎ গুদামগুলোতে এখনো প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন জায়গা খালি রয়েছে।
এদিকে কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ লাখ ৯৪ হাজার ১০৮ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৮ লাখ ৯২ হাজার ১৭৩ মেট্রিক টন। এর মধ্যে প্রায় ৯৭ হাজার ৯২৩ মেট্রিক টন ধান উদ্বৃত্ত রয়েছে।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার হরিরামপুর গ্রামের কৃষক আবদুর রউফ বলেন, এ বছর তাঁর জমিতে প্রায় ২০০ মণ বোরো ধান হয়েছে। পরিবারের খাবারের জন্য ৬০ মণ রেখে বাকি ১৪০ মণ ধান বিক্রি করে সংসারের দায়দেনা পরিশোধ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাজারে ধানের দাম কম থাকায় তিনি লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন।
তিনি বলেন, সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যেত। কিন্তু সেখানে ধান নেওয়া হচ্ছে না। ফলে কোথায় এবং কী দামে ধান বিক্রি করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
সদর উপজেলার চাপাদহ গ্রামের কৃষক হায়দার আলী (৬০) বলেন, তাঁর পরিবারের অন্য কোনো আয় নেই। ধান ও চাল বিক্রি করেই সংসারের খরচ এবং দায়দেনা মেটাতে হয়। বাজারে ধানের দাম কম হওয়ায় পাইকাররা আরও কম দাম বলছেন। সরকারি গুদামে ধান নেওয়া বন্ধ থাকায় তিনি ধান গোলায় রেখে দিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে জেলার বিভিন্ন এলাকার অন্তত ২৫ জন কৃষক জানিয়েছেন, সরকারি ক্রয় বন্ধ থাকায় তাঁরা ধান বিক্রি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারদরের বড় ব্যবধান থাকায় তাঁরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে ধান সংগ্রহ বন্ধ রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কুন্ডু মুঠোফোনে বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অতিরিক্ত ধান কেনা হয়েছে। তাই ধান ক্রয় বন্ধ রাখা হয়েছে।’