বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে গত দুই বছরে তৈরি হওয়া দূরত্ব কাটিয়ে নতুন করে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ এখন দৃশ্যমান। দুই দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের আগ্রহের পাশাপাশি কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা পর্যায়ে ধারাবাহিক যোগাযোগ বাড়ছে। এরই মধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর একের পর এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং তার দ্রুত নয়াদিল্লি সফর ঢাকা–নয়াদিল্লি সম্পর্ককে নতুন গতিপথে নেওয়ার প্রচেষ্টাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
গত সোমবার সকালে ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকের পরই তিনি নয়াদিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। পরদিন মঙ্গলবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বাংলাদেশ ও ভারতের দুই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠককে কূটনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর মধ্যেই সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেন ত্রিবেদী।এর আগের দিন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গেও আলাদা বৈঠক করেন তিনি।
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ভারতের সরাসরি যোগাযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে।
ত্রিবেদীর এই তৎপরতার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট,নয়াদিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে নয়, বরং নতুন বাস্তবতার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে আগ্রহী। একইভাবে ঢাকার পক্ষ থেকেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক সম্মান ও বাস্তব সহযোগিতার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
অপরদিকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের এই তৎপরতার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য এসেছে মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন থেকে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত দুটি পৃথক আমন্ত্রণ জানিয়েছে। একটি হলো দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ, অন্যটি আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, বন্ধু পাল্টানো যায়, কিন্তু প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না।
তারেক রহমান -মোদির বৈঠকের সম্ভাবনা:
তারেক রহমান দিল্লি সফরে গেলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর সরাসরি বৈঠক হবে। সেটিই এখন কূটনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।
ব্রিকস আউটরিচ সেশনে অংশ নিলে বহুপক্ষীয় আয়োজনের পাশাপাশি দুই নেতার বৈঠক হবে। আর যদি তার আগে পৃথক দ্বিপক্ষীয় সফর হয়, তাহলে সেটি হবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তখন পুরো সফরের কেন্দ্রবিন্দু হবে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক।
সেখানে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। বাণিজ্য, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি, যোগাযোগ, ভিসা, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।
এ কারণে তারেক রহমানকে দেওয়া ভারতের পৃথক দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা।
সম্পর্ক জোরদার নজর কাড়ছে ত্রিবেদীর ভূমিকা :
দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগের মধ্য দিয়েই ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখার ইঙ্গিত দিয়েছিল। তাঁর নিয়োগকে সে সময় বিশ্লেষকেরা প্রচলিত কূটনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে একটি বেশি রাজনৈতিক ও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের উদ্যোগ হিসেবে দেখেছিলেন। বিশেষ করে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে টানাপোড়েনে থাকার প্রেক্ষাপটে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিককে ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হয়।
সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে সেই ধারণারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সহ সরকারের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক, দ্রুত নয়াদিল্লি সফর এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সঙ্গে সাক্ষাৎ—সব মিলিয়ে ত্রিবেদী কার্যত দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে একটি সক্রিয় যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে এর আগে প্রকাশিত বিশ্লেষণেও বলা হয়েছিল, ত্রিবেদীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
দুই পক্ষেরই আগ্রহ সম্পর্ক জোরদারে :
সম্পর্ক পুনর্গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের আগ্রহ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য ও জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে আসছেন। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে সংঘাতের জায়গায় না রেখে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার একটি বাস্তববাদী অবস্থান দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও নতুন সরকারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারতের পক্ষ থেকে তাঁকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও প্রকাশ্যে বলেছেন, দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হলে বর্তমান অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানের পথ সহজ হতে পারে। অর্থাৎ নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নিরাপত্তা পর্যায়েও যোগাযোগ বাড়ছে :
শুধু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়েই নয়, নিরাপত্তা ক্ষেত্রেও দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ছে।
গত ৯ ও ১০ আগস্ট ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং—‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন বাংলাদেশ সফর করেছেন। তাঁর সফরে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে।
ফলে একই সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং গোয়েন্দা পর্যায়ে যোগাযোগের যে ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে, সেটিকে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই দেখছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কে যে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে একাধিক কারণ ছিল। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, প্রত্যর্পণ ইস্যু, সীমান্ত, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক আস্থার সংকট—সব মিলিয়ে সম্পর্কের বিভিন্ন স্তরে অস্বস্তি তৈরি হয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশই সেই অস্বস্তির বাইরে গিয়ে বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ভারতের জন্য বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত প্রতিবেশী। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতির কারণে ঢাকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্যও ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক প্রয়োজন বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে। ফলে দুই দেশের স্বার্থের জায়গায় অনেকগুলো অভিন্ন ক্ষেত্র রয়েছে।