অনেকদিন ভেবেছি-
মাকে নিয়ে এক দিস্তা কবিতা লিখবো।
একদিন খুব ভোরে,
অথবা কোনো নিঃশব্দ মধ্যরাতে
শব্দের দরজা খুলে বসবো,
আর একে একে সাজিয়ে দেবো-
মায়ের মুখ…মায়ের হাত,
মায়ের পরার্থ অবয়ব,
অদৃশ্য আশীর্বাদের মোহনীয় আলোয়।
কিন্তু পারি না
কিছুতেই লিখতে পারি না।
মাকে নিয়ে লিখতে গেলেই
আমার কলমের আগেই কেঁপে ওঠে আমার শিরা।
শব্দের আগে এসে দাঁড়ায়
একটি মুখ-
গোটা পৃথিবী থেকে আলাদা এক মুখ।
কারণে-অকারণে,
সবলে-দুর্বলে,
হাসি-কান্নায়,
আমার অহংকার আর পরিনত পরাজয়ে
তিনিই এক নির্মোহ পরশপাথর-
যার স্পর্শে
আমার সমস্ত শূন্যতা
কখন যে পূর্ণ হয়ে উঠেছিল
বুঝতেই পারিনি।
আমার শিরা-ধমনীর
প্রতিটি স্পন্দনে
তাঁরই একক অদৃশ্য অনুস্বাক্ষর।
আমার রক্তের প্রতিটি ফোঁটা
তাঁরই কোনো অসমাপ্ত বাক্য,
যা আমি সারাজীবন বয়ে বেড়াচ্ছি
একান্ত অজান্তে, স্বশ্রদ্ধ গভীরতায়।
তিনি ছিলেন
আমার পৃথিবীর প্রথম ঠিকানা,
প্রথম নিরাপত্তা,
প্রথম প্রার্থনা,
প্রথম আশ্রয়।
অনন্ত এক অনুভূতির অতল সমুদ্রে
আমার সেই হিমালয়টা আজ
শুয়ে আছেন হাসপাতালের বিছানায়
সাদা চাদরের নিচে
পরাজিত অনুভুতি হয়ে।
মনিটরের পর্দায়
একটি রেখা ওঠে….নামে,
আর আমার সমস্ত পৃথিবীও
সেই ক্ষীণ ওঠানামার সঙ্গে
উঠে…..নামে,
এরপর বিন্দুতে এসে থেমে যায়।
মা তো কোনো শব্দ নন-
তিনি আমার অস্তিত্বের ব্যাকরণ।
তিনি আমার রক্তের ভিতর
লুকিয়ে থাকা এক অনন্ত উচ্চারণ।
তাই তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখতে গেলে
আমি কবি হতে পারি না
আমি শুধু বার বার তাঁর সন্তান হয়ে যাই।
কলম থেমে যায়,
শব্দ হারিয়ে যায়,
চোখের কোণে জমে ওঠে
অসংখ্য না-বলা আখ্যান।
তাই তো মাকে নিয়ে
কবিতা লিখতে পারি না।
আর যদি কোনোদিন
আমার সমস্ত শব্দ ফুরিয়ে যায়,
সেদিন শেষ পৃষ্ঠাটিতে আমি
শুধু একটি শব্দই লিখতে চাই-
মা।