শিল্পজোনে বিনিয়োগে বদলে যাবে সামগ্রিক অর্থনীতি চিত্র

এসএম শামসুজ্জোহা

জাতীয়

বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ এবং ভূ-রাজনীতির কৌশলগত মোড়ে দাঁড়িয়ে কোনো দেশের জন্য অর্থনৈতিক সচলতা ধরে রাখা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এই বৈশ্বিক

2026-08-03T12:06:33+00:00
2026-08-03T12:06:33+00:00
  মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬,
২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
এক দশক পর নতুন অধ্যায়ের সূচনা
শিল্পজোনে বিনিয়োগে বদলে যাবে সামগ্রিক অর্থনীতি চিত্র
এসএম শামসুজ্জোহা
সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৬ পিএম 
এআই ছবি
বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ এবং ভূ-রাজনীতির কৌশলগত মোড়ে দাঁড়িয়ে কোনো দেশের জন্য অর্থনৈতিক সচলতা ধরে রাখা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এই বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মাঝে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থব্যবস্থা ও টেকসই শিল্পায়নে এক ইতিবাচক আশার আলো নিয়ে হাজির হয়েছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক আঞ্চলিক সংযোগ ও বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু শিল্পে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে নতুন এই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলার অন্যতম বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।  

শিল্পজোনে চীনা বিনিয়োগে বদলে যাবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি। এ প্রকল্পটি বাংলাদেশ-চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মাইলফলক। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম বন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় এ শিল্পজোনের অবস্থানগত গুরুত্ব অপরিসীম। তথ্যমতে, দীর্ঘ এক দশকের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে সম্প্রতি চট্টগ্রামে ‘চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের’ (সিইআইজেড) পথচলা শুরু হওয়ায় নতুন আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পটিতে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হয়েছে। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দেড় লাখেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের সাথে সেতুবন্ধন রচনা করবে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী আনোয়ারার বেলচূড়ার বিশেষ এ শিল্পজোন। এতে একটি আধুনিক শিল্প লজিস্টিক হাব হিসেবে বাণিজ্যিক রাজধানীর পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে চট্টগ্রাম। 

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশে আগামীতে অর্থনীতি এবং শিল্পায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে চায়না অর্থনৈতিক অঞ্চল। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, আজকের এ বিনিয়োগ সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি বলেন, আমরা ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়েছি। এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেড় লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হলেও অবকাঠামোসহ সব বিনিয়োগ মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করা হবে।

সূত্র জানায়, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার সরকারি লক্ষ্য বাস্তবায়নে এ বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন), সেবা খাত এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের আবাসন গড়ে উঠবে। এর সুফল আনোয়ারার গন্ডি ছাড়িয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে। বিনিয়োগের সাথে সাথে ব্যবসা, চাকরি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে। কর্ণফুলী টানেলকে ঘিরে আনোয়ারায় নগর সম্প্রসারণ তথা চীনের সাংহাই শহরের মতো কর্ণফুলী নদীর দুই তীর নিয়ে চট্টগ্রাম শহরকে ওয়ান সিটি টু টাউনে রূপান্তর আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।

তথ্যমতে, চট্টগ্রামে প্রথম এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন বা ইপিজেড প্রতিষ্ঠা হয়েছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। দেশের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় চট্টগ্রাম ইপিজেডে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামের দ্বিতীয় ইপিজেড কর্ণফুলী ইপিজেড। তার হাত ধরে ২০০২ সালে যাত্রা শুরু করে দেশে প্রথম বেসরকারি ইপিজেড কোরিয়ান ইপিজেডের।

জানা যায়, উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বেগম খালেদা জিয়া প্রথম চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। এ ধারাবাহিকতায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরেই দেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পথচলা শুরু হয়েছে। বিগত ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের সীমাহীন দুঃশাসন, লুটপাট আর পুঁজি পাচারে ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তারই অংশ হিসাবে বিদেশি বিনিয়োগের অচলায়তন ভাঙতে তিনি চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন।

সম্প্রতি তার চীন সফরের সময় ৩০টির বেশি চীনা কোম্পানি এই জোনে প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিদেশি বিনিয়োগে দেশের প্রথম এ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের অগ্রাধিকার উল্লেখ করে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি প্রকল্পটিতে শিল্প কারখানা চালু করতে দেড় বছরের চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এক বছরের মধ্যেই সেখানে কারখানা চালুর লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজার) তথ্যমতে, চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলটি দেশের প্রথম বিশেষায়িত জি-টু-জি অর্থনৈতিক অঞ্চল। এটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১৮ কিলোমিটার এবং শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে ২০ কি.মি. দূরে কর্ণফুলী নদীর ওপারে। প্রায় ৮০০ একর জমির উপর গড়ে উঠছে চীনা এ শিল্পজোন। প্রকল্পটির অবকাঠামো উন্নয়ন শুরু হয়েছে। ডিপিপি অনুযায়ী এতে মোট ব্যয় প্রায় ৪,১৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২,৪৬৭ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ সহায়তা এবং প্রায় ১,৭২২ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় করা হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিল্পজোন স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবহন ও জেটি সুবিধাসহ আন্তর্জাতিকমানের সকল সহায়ক অবকাঠামো নিশ্চিত হবে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ডিসেম্বর ২০৩১ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বেজার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর বলেন, চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের অতিথি। তারা এখানে বিনিয়োগের পাশাপাশি নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থও দেখবেন। তবে এর মাধ্যমে দেশের হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তিনি আনোয়ারাসহ চট্টগ্রামের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের চীনা বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘এই জোন যত দ্রুত চালু হবে, তত দ্রুত এ এলাকার চেহারা বদলে যাবে। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত শিল্পাঞ্চলটি চালু করা এবং চট্টগ্রামের মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।’ তার মতে, কোনো ধরনের সমস্যা দেখা দিলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে সমাধান করতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: