গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদ অনুমোদন পেলেও সংবিধানে এখনো সংশোধন না হওয়ায় আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিদ্যমান আইন অনুসারেই অনুষ্ঠিত হবে। ফলে এবারও গোপন ব্যালটের পরিবর্তে আগের নিয়ম বহাল থাকবে। একাধিক প্রার্থী হলে সংসদ সদস্যরা ব্যালটে স্বাক্ষর করে প্রকাশ্যে ভোট দেবেন।
জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এ প্রস্তাবের একটি অংশে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত এসব ক্ষমতা কার্যকর হবে না।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকারি দল ইতোমধ্যে সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে। তবে বিরোধী দল এতে অংশ নেয়নি। তাদের দাবি, শুধু সংবিধান সংশোধন নয়, গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার করা উচিত।
এদিকে সরকারি দলের সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রথম বৈঠকও এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পুরো সংশোধন প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে এসব পরিবর্তন কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগে তারা স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে। এটি প্রচলিত প্রক্রিয়ার অংশ। আগামী সপ্তাহে তপশিল ঘোষণার সম্ভাব্য সময় জানা যেতে পারে। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়েন। সে হিসেবে আগামী ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিলে সর্বোচ্চ ২৫ দিন সময় রাখার নজির রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী সেপ্টেম্বরেই নির্বাচন হতে পারে। তবে যদি একজন মাত্র প্রার্থী থাকেন, তাহলে তারও আগে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এর আগে রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৭৭ দিন তৎকালীন স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালের ২০ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪ দিন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন মো. আবদুল হামিদ।
২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হয় এবং ২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। পুরো প্রক্রিয়ার জন্য ২০ দিন সময় রাখা হয়। তবে আবদুল হামিদ একমাত্র বৈধ প্রার্থী হওয়ায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। ওই বছরের ২১ এপ্রিল ছিল মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন এবং ২২ এপ্রিল যাচাই-বাছাই শেষে অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় সেদিনই তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়।
বর্তমান সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন রয়েছে। নির্বাচন হবে ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী। ওই আইনের ১০ ধারা অনুসারে প্রকাশ্যে ভোট দেওয়ার বিধান থাকায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ছাড়া অন্য কারও নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
এ কারণেই জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেবে না বলে আলোচনা রয়েছে। দলটির নেতারা ইতোমধ্যে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একমাত্র ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থনে ১৭২ ভোট পেয়ে আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
জুলাই সনদে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পরিবর্তনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সংসদের দুই কক্ষের মোট ৪৫০ সদস্যের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে এটি এমন একটি প্রস্তাব, যেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের নোট অব ডিসেন্ট ছিল না। তবে সংবিধান সংশোধন না হওয়ায় এখনো ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ গঠন করা হয়নি।
ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতিকে ছয়টি প্রতিষ্ঠানে এককভাবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ।
তবে বিএনপি এ প্রস্তাবের একটি অংশে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। দলটি রাষ্ট্রপতির হাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষে নয়। গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে যে নয়টি সংস্কার প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, এটি তার একটি।
বিএনপি বলছে, সংবিধান সংশোধনের সময় তাদের নোট অব ডিসেন্ট বিবেচনায় নেওয়া হবে। যদিও বিরোধী দল এ অবস্থানের সঙ্গে একমত নয়। তবে সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মতামতই সংবিধান সংশোধনে প্রাধান্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্য নিয়োগের ক্ষমতা নাও পেতে পারেন।
বর্তমান সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ছাড়া অন্য সব সাংবিধানিক দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী পালন করেন। এছাড়া ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন ব্যক্তিকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে হয়। ফলে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতির স্বাধীন ক্ষমতা খুবই সীমিত। জুলাই সনদে প্রস্তাবিত অতিরিক্ত নিয়োগ ক্ষমতা কার্যকর করতে হলেও সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য।