চাপে পরিবহন ও শিল্প খাত, ভোগান্তিতে ভোক্তা

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

দেশজুড়ে আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে গ্যাস সংকট। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আবাসিক,

2026-07-27T13:05:49+00:00
2026-07-27T13:05:49+00:00
  সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬,
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
বাড়ছে গ্যাস সংকট
চাপে পরিবহন ও শিল্প খাত, ভোগান্তিতে ভোক্তা
শাকিল আহমেদ
সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ১:০৫ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
দেশজুড়ে আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে গ্যাস সংকট। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আবাসিক, শিল্প ও পরিবহন, সব খাতেই এর প্রভাব পড়েছে। কোথাও দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না, কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। 

অন্যদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে শত শত যানবাহনের দীর্ঘ সারি এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। এক পাম্পে গ্যাস না পেয়ে আরেক পাম্পে ছুটছেন চালকেরা। এতে সময় ও জ্বালানি, দুইয়েরই অপচয় বাড়ছে।

জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এমনিতেই দেশে গ্যাসের চাহিদার তুলনায় বড় ঘাটতি ছিল। নতুন এই পরিস্থিতিতে সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।

রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কলাবাগান, বাড্ডা, কাফরুল, ধানমন্ডি, কাঁঠালবাগানসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, দিনের বেলায় চুলা প্রায় জ্বলেই না। অনেক পরিবার গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন রান্না করছে। কেউ বাধ্য হয়ে ইন্ডাকশন চুলা বা এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে ঝুঁকছেন। এতে মাসিক ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

পাম্প থেকে পাম্পে ঘুরছে সিএনজি : সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন সিএনজিচালিত যানবাহনের চালকেরা। রাজধানীর অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে ‘গ্যাস নেই’ কিংবা ‘লো প্রেসার’ লেখা নোটিশ টাঙানো দেখা যাচ্ছে। কোথাও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না। আবার কোথাও অর্ধেক ট্যাংক ভর্তি করেই ফিরে যেতে হচ্ছে।

সিএনজি চালকেরা বলছেন, আগে একটি পাম্পেই কাজ হয়ে যেত। এখন একের পর এক স্টেশন ঘুরেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে রাতভর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন, তবুও পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না। এতে যাত্রী পরিবহন কমে যাওয়ায় আয়ও কমছে।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিকদের সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবে একটি স্টেশন চালাতে যে পরিমাণ গ্যাসচাপ প্রয়োজন, বর্তমানে অনেক এলাকায় তার এক-তৃতীয়াংশও পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও চাপ নেমে এসেছে ২ থেকে ৫ পিএসআইয়ে। ফলে অনেক স্টেশন আংশিক কিংবা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

শিল্পেও উৎপাদন ব্যাহত : গ্যাস সংকটের ধাক্কা লেগেছে শিল্প খাতেও। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সীমিত সক্ষমতায় চলছে, আবার কোথাও উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। 

উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন কমে গেলে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পে দীর্ঘ সময় গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে শুধু উৎপাদন নয়, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও এর প্রভাব পড়বে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ : দেশে উৎপাদিত গ্যাসের বড় অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়। এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমেছে। এতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। চাহিদা বাড়লে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সংকটের মূল কারণ কী? 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি। তবে এটি একদিনের সমস্যা নয়। 

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমছে। সেই ঘাটতি পূরণে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে কোনো একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই জাতীয় সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ স্বাভাবিক সময়েও উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে। এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটির পর সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় সংকট প্রকট হয়েছে।

সরকারের পদক্ষেপ : বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত সচল করতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি প্রস্তুত রয়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরাও মেরামতকাজে যুক্ত হয়েছেন। টার্মিনাল চালু হলে ধীরে ধীরে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টার্মিনাল চালু হলেও পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

বাড়ছে জনভোগান্তি : এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। রান্না করতে না পেরে অনেকে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন। আবার অনেক পরিবার অতিরিক্ত খরচ করে এলপিজি সিলিন্ডার কিনছেন। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। 

অন্যদিকে পরিবহন খাতে সিএনজির সংকটে যাত্রীদেরও অপেক্ষা বাড়ছে। চালকেরা পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক যানবাহন রাস্তায় নামতে পারছে না। ফলে কিছু এলাকায় যাত্রী পরিবহনেও প্রভাব পড়ছে।

এ বিবষয়ে জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। 

তিনি জানান, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে সরকার চতুর্থ এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকে এলএনজি আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখন্ডে আনা, নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভার, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে একযোগে কাজ করছে। 

এদিকে পট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কারিগরি দল কাজ করছে, তবে এখনো টার্মিনাল চালুর উপযোগী অবস্থায় আনা যায়নি। আরও সময় লাগতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের তাগিদ : তবে জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সাময়িক মেরামতের মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। 

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানো, এলএনজি অবকাঠামো আরও বহুমুখী করা, সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে গ্যাস ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণও জরুরি। 

তাদের মতে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের সংকট ঘুরে ফিরে আসতে পারে। আর এর মূল্য দিতে হবে সাধারণ ভোক্তা, পরিবহন খাত এবং শিল্প উদ্যোক্তাদেরই। 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: