সুন্দরবনে বাড়ছে চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য

মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) সংবাদদাতা

সারাদেশ

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে দেশের অন্যতম রক্ষাকবচ এবং ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন এখন বহুমুখী হুমকির মুখে। বন

2026-07-23T21:07:49+00:00
2026-07-23T21:07:49+00:00
  শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬,
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
সুন্দরবনে বাড়ছে চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য
এক বছরে ২৯৪ মামলা, গ্রেফতার ৩৯৬; তবু থামছে না হরিণ শিকার, বিষ দিয়ে মাছ ধরা ও বনসম্পদ লুট
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) সংবাদদাতা
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৯:০৭ পিএম 
ছবি ভোরের ডাক
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে দেশের অন্যতম রক্ষাকবচ এবং ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন এখন বহুমুখী হুমকির মুখে। বন বিভাগের ধারাবাহিক অভিযান, মামলা ও গ্রেফতার সত্ত্বেও থামছে না চোরা শিকারি, বনজ সম্পদ লুটেরা ও অবৈধ মৎস্য শিকারি চক্রের তৎপরতা। বরং অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব অপরাধী চক্র আগের চেয়ে আরও সংঘবদ্ধ ও কৌশলী হয়ে উঠেছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে বন অপরাধে ২৯৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৯৬ জনকে গ্রেফতার করা হলেও এখনও ৬৩ জন পলাতক রয়েছেন।

একই সময়ে বন বিভাগ উদ্ধার করেছে ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস, ৫ হাজার ৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ, ৬ হাজার ৯৮৬টি অবৈধ কাঁকড়া ধরার ফাঁদ এবং বিপুল পরিমাণ মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সরঞ্জাম।

সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন অপরাধ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। হরিণ শিকার, বিষ প্রয়োগে মাছ ধরা, অভয়ারণ্যে অবৈধভাবে কাঁকড়া আহরণ এবং বনজ সম্পদ পাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে সক্রিয় নেটওয়ার্ক।

গত এক বছরে অভয়ারণ্যে মাছ ও কাঁকড়া আহরণের অভিযোগে ১০৬টি, বিষ দিয়ে মাছ শিকারের ঘটনায় ৩৩টি এবং হরিণ শিকার ও বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত ৩৩টি মামলা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান, অনেক সময় অভিযানের তথ্য আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় অপরাধীরা নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যায়। আবার দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অনেক ক্ষেত্রে অভিযানে বিলম্ব হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে হরিণ শিকারে আধুনিক ফাঁদ ও সংঘবদ্ধ দল ব্যবহার করছে শিকারিরা। গভীর বনের নির্জন এলাকায় দীর্ঘ ফাঁদ পেতে রাখা হয়। রাতে বনে প্রবেশ করে হরিণ জবাই করে দ্রুত নদীপথে মাংস পাচার করা হয়।

গত এক বছরে উদ্ধার হওয়া ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস ও ৫ হাজার ৭১২ মিটার ফাঁদ পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে।

বন বিভাগ হরিণ শিকার ও বন্যপ্রাণী নিধনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ১৩৫ জনের একটি বিশেষ তালিকা প্রস্তুত করেছে। তাদের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

হরিণ শিকারের পাশাপাশি সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার প্রবণতাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এতে শুধু মাছ নয়, জলজ প্রাণী ও পুরো নদী-বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ৮৭ বোতল নিষিদ্ধ কীটনাশক জব্দ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিষ দিয়ে মাছ শিকার সাময়িকভাবে বেশি মাছ আহরণের সুযোগ সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

প্রায় ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত সুন্দরবন পাহারা দিতে গিয়ে জনবল ও সরঞ্জামের সংকটে পড়ছে বন বিভাগ।

খুলনা রেঞ্জের বিভিন্ন স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির কর্মকর্তারা জানান, অনেক সময় পর্যাপ্ত জনবল ছাড়াই দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনা করতে হয়। আধুনিক জলযান, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার ঘাটতিও রয়েছে।

পরিবেশ ও বন বিশেষজ্ঞদের মতে, বন অপরাধের অন্যতম কারণ বননির্ভর মানুষের অর্থনৈতিক সংকট। উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো পরিবার মাছ, কাঁকড়া, মধু ও গোলপাতা সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকেই জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে বনাঞ্চলে প্রবেশ করেন।

বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির বলেন, আইন প্রয়োগ প্রয়োজন, তবে শুধু অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে বন অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।

সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, স্মার্ট টহল টিম, বিশেষ টহল টিম ও ফুট পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করা হচ্ছে। ড্রোনসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। তবে অপরাধ দমনে সামাজিক অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, অভিযানের সময় কিছু ক্ষেত্রে জেলেদের আগ্রাসী আচরণ আইন প্রয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তবুও বনরক্ষীরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।

পশ্চিম সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, বনরক্ষীরা চরম ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, ড্রোন ব্যবহার ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে বন অপরাধ আগের তুলনায় কমেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

পরিবেশবিদদের মতে, সুন্দরবন রক্ষায় শুধু অভিযাননির্ভর কৌশল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। এর মধ্যে রয়েছে—

বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি।

আধুনিক প্রযুক্তি ও জলযাননির্ভর নজরদারি বৃদ্ধি।

স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা।

বন অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

সীমান্ত ও নদীপথে নজরদারি আরও জোরদার করা।


বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি দেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি এবং উপকূলীয় জনপদের নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু অভিযান, মামলা ও গ্রেফতারের পরও যদি চোরা শিকারি ও পাচারকারীরা সক্রিয় থাকে, তবে সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর, প্রযুক্তিনির্ভর এবং জনসম্পৃক্ত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।



Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: