রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে চলমান আলোচনাকে ‘গুঞ্জন’ বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যগত বা অন্য কোনো কারণে পদত্যাগ করতে চাইলে সংবিধানে সেই সুযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই এবং সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন তো গুঞ্জনই। সেটি যদি বাস্তবে ঘটে, তখন বিষয়টি দেখা হবে।’
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যগত কিংবা ব্যক্তিগত অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব ছাড়তে চাইলে তা সাংবিধানিকভাবে সম্ভব। তবে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চেয়েছেন—এমন কোনো তথ্য তার জানা নেই।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এ বিষয়ে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। সরকারের পক্ষ থেকেও কিছু বলা হয়নি। তিনি (রাষ্ট্রপতি) স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করতে চেয়েছেন কিনা, সেটি তাকেই জিজ্ঞেস করতে হবে।’
বিদেশে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কোনো ফোনালাপ হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব ছাড়তে চাইলে তাকে জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে হবে। এরপর সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে সাংবিধানিকভাবে সেই সুযোগ আছে। সরকার এ বিষয়ে কিছু বলেনি। আমিও পত্রিকায় এসব খবর দেখছি। তিনি যদি পদত্যাগ করতে চান, তাহলে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন। এরপর রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সেটি পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত হবে।’
উল্লেখ্য, মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। সংবিধান অনুযায়ী, তার পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। সে সময় শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন এবং সংসদ বিলুপ্ত ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন।
গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছিল আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা। বঙ্গভবন ঘেরাওসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করা হয়। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অপসারণে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সে সময় সাংবিধানিক শূন্যতার আশঙ্কায় বিএনপিও তার পদত্যাগ চায়নি বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল।
পরে ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাহাবুদ্দিন জানান, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে তিনি পদত্যাগ করতে চান। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আচরণে তিনি অপমানিত বোধ করেছেন।
এরপর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, সরকার চাইলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন, অন্যথায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন।
সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
এ ছাড়া সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বর্তমান সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
যদিও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করেছে, তবুও রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। তবে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটবে এবং সরকার প্রথমবারের মতো নিজেদের মনোনীত একজনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার সুযোগ পাবে।