দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের নীতিগত চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (২২ জুলাই) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে দৈনিক বণিক বার্তা এ কনক্লেভের আয়োজন করে। এতে জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগীসহ পাঁচ শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন।
বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে দেশের জ্বালানি খাতে কার্যকর পরিকল্পনার অভাব ছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়া হলেও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, দেশে ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হলেও সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। গত ১৭ বছরে একটি গ্যাসকূপও খনন না হওয়ায় দেশ এখন আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে দেশে মাত্র দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) রয়েছে। এর একটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ায় গ্যাস সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, আজ এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে গেছে। ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষ গ্যাস ও সিএনজি পাচ্ছে না। অনেক জায়গায় মানুষ সড়ক অবরোধ করছে। এটি প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এলএনজি আমদানির অবকাঠামো শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী যেখানে সম্ভব, সেখানে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা হবে।
তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর বেসরকারিকরণ দেখতে চাই। সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহ করবে, আর খুচরা বিতরণ দক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা উচিত।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, এমপি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, দেশের স্থানীয় জ্বালানি সম্পদ খুব বেশি নয়। ২০১৬-১৭ সালে স্থানীয় উৎস থেকে দৈনিক ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, মিয়ানমার ও ভারতের উপকূলে নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান মিললেও গত ১৭ বছরে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে কার্যকর অনুসন্ধান চালাতে পারেনি। এখনই জরিপ শেষ হলেও অফশোরে গ্যাসের মজুত নিশ্চিত হতে আরও অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগবে।
প্যানেল আলোচনায় ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, যেকোনো নীতি প্রণয়নের আগে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি অভিযোগ করেন, সোলার খাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাম্প্রতিক শুল্কনীতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
শিল্পে গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা দূর করতে তিনি একটি ‘প্রেডিক্টেবল রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক’ বা পূর্বানুমানযোগ্য নীতিকাঠামো প্রণয়নের আহ্বান জানান।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্য পেম বলেন, জ্বালানি শুধু একটি খাত নয়; এটি বেসরকারি বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও রাজস্ব ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশের গ্যাসের চাহিদার ৩০ শতাংশ, তেলের ৯৫ শতাংশ এবং কয়লার ৯০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। ফলে বৈশ্বিক বাজারে মূল্য ওঠানামা ও সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব পড়ে।
ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং এমসিসিআইয়ের সহসভাপতি সিমিন রহমান বলেন, শিল্পখাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু বিদ্যুতের প্রাপ্যতা নয়, বরং নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত সরবরাহ নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিং, ভোল্টেজের ওঠানামা ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে।
আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য শুধু ছাদের ওপর নির্ভর না করে সরকারি অব্যবহৃত জমি দ্রুত লিজ দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা ও নীতিগত স্থিতিশীলতা ছাড়া দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারীই বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না।
ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যাংকের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আটকে আছে। শুধু ট্রাস্ট ব্যাংকেরই প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এ সংকটের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে।
কনক্লেভে আরও বক্তব্য দেন পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি’র সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম রিজওয়ান খান, বুয়েটের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, আইডিকলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর মোরসেদ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এনামুল হক এবং ওমেরা রিনিউয়েবল এনার্জি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদুর রহিম।