বাংলাদেশের চরাঞ্চলের প্রকৃতি শুধু সবুজে নয়, নানা মৌসুমি সম্পদেও সমৃদ্ধ। বর্ষা শুরুর এই সময়ে মেঘনাবেষ্টিত বিস্তীর্ণ চরে ফুটে ওঠা হোগলা ফুল থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে (হোগলার বৈজ্ঞানিক নাম Typha) ‘হোগল’—হলুদাভ রঙের এক ধরনের পুষ্টিকর প্রাকৃতিক গুঁড়া, যা দিয়ে তৈরি হয় ফিরনি, পায়েশ, হালুয়া, পিঠা-পুলি, সন্দেশসহ নানা সুস্বাদু খাবার। চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার চরাঞ্চলে এখন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই হোগল সংগ্রহে ব্যস্ত শতাধিক কৃষক ও সংগ্রহকারী। মৌসুমি এই প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ, তেমনি অনেক পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
সোমবার (২০ জুলাই) উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কৃষকেরা বাড়ির আঙিনা ও খোলা জায়গায় হোগলা গাছের ফুল রোদে শুকাচ্ছেন। কোথাও শুকিয়ে যাওয়া ফুল আলতোভাবে টোকা দিয়ে সোনালি-হলুদ রঙের সূক্ষ্ম গুঁড়া সংগ্রহ করা হচ্ছে। দেখতে অনেকটা হলুদের গুঁড়া বা ময়দার মতো হলেও এর রং হালকা হলুদ এবং স্বাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয়দের কাছে এটি সুস্বাদু ও পুষ্টিকর মৌসুমি খাদ্য হিসেবে বেশ জনপ্রিয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মেঘনা নদীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে হোগলা গাছ। বর্ষার শুরুতে গাছে ফুল এলে কৃষকেরা নৌকায় করে চরাঞ্চলে গিয়ে সেই ফুল সংগ্রহ করেন। এরপর কয়েক দিন রোদে ভালোভাবে শুকানো হয়। ফুল শুকিয়ে গেলে ধীরে ধীরে টোকা দিলে ভেতর থেকে সূক্ষ্ম গুঁড়া বের হয়ে পাত্রে জমা হয়। পরে চালুনি দিয়ে ছেঁকে বিশুদ্ধ হোগল আলাদা করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ হলেও এটি স্থানীয় মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি আয়ের উৎস।
স্থানীয়দের ভাষ্য, হোগল দুধ, নারকেল, চিনি বা গুড় দিয়ে রান্না করলে অত্যন্ত সুস্বাদু খাবারে পরিণত হয়। অনেক পরিবারে বিশেষ অতিথি আপ্যায়ন ও পারিবারিক আয়োজনে এটি পরিবেশন করা হয়। শিশু থেকে বয়স্ক—সব বয়সী মানুষের কাছেই এই খাবারের কদর রয়েছে।
চরভৈরবী ইউনিয়নের পাড়া বগুলা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে হোগল সংগ্রহ ও বিক্রি করেই আমরা জীবিকা নির্বাহ করছি। মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে চর থেকে হোগলা ফুল কেটে আনতে অনেক কষ্ট হয়। এরপর শুকানো, গুঁড়া সংগ্রহ ও বাজারজাত—সব মিলিয়ে কাজটি খুবই পরিশ্রমের। তবে বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় সেই কষ্ট সার্থক মনে হয়।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি কেজি হোগল ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উন্নত মানের হোগলের চাহিদা থাকায় স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন উপজেলাতেও এটি বিক্রি হয়। অনেক ব্যবসায়ী সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কিনে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করেন। ফলে বর্ষা মৌসুমে অনেক পরিবারের জন্য এটি বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করছে।
তবে কৃষি বিভাগের মতে, হোগলা গাছ অর্থনৈতিকভাবে কিছু মানুষের উপকারে এলেও এর ব্যাপক বিস্তার কৃষির জন্য ইতিবাচক নয়। হাইমচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাকিল খন্দকার বলেন, আমরা কৃষকদের পরিকল্পিতভাবে হোগলা চাষ না করার পরামর্শ দিয়ে থাকি। কারণ, হোগলা দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়লে অন্যান্য ফসলের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তিনি আরও বলেন, চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো হোগলা গাছ থেকে ফুল সংগ্রহে কৃষি বিভাগের কোনো আপত্তি নেই। তবে কৃষিজমিতে নতুন করে হোগলার আবাদ না করে লাভজনক ও খাদ্যশস্যভিত্তিক ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, হোগল শুধু একটি মৌসুমি খাদ্য নয়; এটি হাইমচরের চরাঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও অংশ। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই গ্রামীণ জনপদে হোগল সংগ্রহের এই চিত্র দেখা যায়। কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে কৃষকেরা প্রকৃতির দেওয়া এই সম্পদ সংগ্রহ করেন এবং বাজারজাত করে সংসারের খরচ মেটান।
প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া এই মুখরোচক খাদ্য একদিকে যেমন স্থানীয় মানুষের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য এনে দেয়, অন্যদিকে অনেক পরিবারের জন্য মৌসুমি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবেও ভূমিকা রাখছে। তবে কৃষি উৎপাদনের ভারসাম্য রক্ষায় পরিকল্পিতভাবে হোগলা চাষ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।