প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরের রাজপরিবারের নারীরা কেবল রাজপ্রাসাদের অলংকার ছিলেন না, বরং দক্ষ ধনুর্বিদ ও প্রশিক্ষিত যোদ্ধাও ছিলেন—এমনই চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। দাহশুরে আবিষ্কৃত পাঁচ রাজকন্যা ও এক রাজার কঙ্কাল পুনঃবিশ্লেষণ করে গবেষকেরা তাঁদের অস্ত্রচর্চা, কঠোর শারীরিক প্রশিক্ষণ এবং উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার প্রমাণ পেয়েছেন।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সাময়িকী Frontiers in Environmental Archaeology-তে। গবেষণার নেতৃত্ব দেন মিসরের বেনি-সুয়েফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. জেইনাব হাশেশ।
গবেষকদের ভাষ্য, কায়রোর মিসরীয় জাদুঘরের বেসমেন্টে শতাধিক বছর ধরে সংরক্ষিত থাকা কঙ্কালগুলো পুনরায় পরীক্ষা করে দেখা যায়, রাজকন্যাদের বাহু, কাঁধ ও হাতের হাড়ে দীর্ঘদিন ধনুক চালানোর স্পষ্ট শারীরিক পরিবর্তনের ছাপ রয়েছে। ধনুক টানার ফলে শরীরের এক পাশের হাড় ও পেশি অন্য পাশের তুলনায় বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে, আর কঙ্কালেও সেই বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
১৮৯৪ ও ১৮৯৫ সালে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক জ্যাক দ্য মরগান দাহশুর থেকে রাজকন্যা ইতা, খেনমেত, ইতাওয়েরেত, সম্ভবত সাতাথোরমেরিয়েত, নুব-হোটেপ এবং রাজা হোরের সমাধি আবিষ্কার করেন। পরে কঙ্কালগুলো দীর্ঘদিন বিস্মৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। ২০২০ সালে জাদুঘরের বেসমেন্টে দুটি কাঠের বাক্স খুলে গবেষকেরা আবার এগুলো উদ্ধার করেন। তখনও কিছু হাড় ১৮৯০-এর দশকের সংবাদপত্রে মোড়ানো অবস্থায় ছিল।
সমাধিতে ধনুক, তীর, গদা ও রত্নখচিত ছুরি পাওয়া গেলেও এত দিন সেগুলোকে রাজকীয় মর্যাদার প্রতীক হিসেবে ধরা হতো। তবে নতুন বিশ্লেষণে গবেষকেরা বলছেন, অস্ত্রগুলো কেবল অলংকার ছিল না; এগুলো বাস্তবেই ব্যবহৃত হতো।
রাজকন্যা নুব-হোটেপের হাত ও কবজির হাড়ে বারবার ধনুক ধরার চাপের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাঁর তালুর একটি হাড়ও দীর্ঘমেয়াদি চাপের কারণে সামান্য বাঁকা হয়ে গেছে। রাজকন্যা ইতাওয়েরেতের কাঁধ ও বুকের পেশির সংযুক্তিস্থলেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। অন্যদিকে রাজকন্যা ইতার হাতের শক্তিশালী গঠন ইঙ্গিত দেয়, তিনি ছুরির মতো অস্ত্র ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন। একই ধরনের অসম হাড়ের বিকাশের প্রমাণ মিলেছে রাজা হোরের কঙ্কালেও।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, রাজপরিবারের সদস্যদের জীবনও সবসময় আরামদায়ক ছিল না। কঙ্কালে শৈশবের অপুষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ, হাড় ক্ষয়, বিপাকজনিত চাপ এবং একাধিক পুরোনো ভাঙা হাড়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে। রাজকন্যা ইতাওয়েরেত একসময় পাঁজর ও পায়ের হাড়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
তবে গবেষকদের মতে, রাজপরিবারের সদস্য হওয়ায় তাঁরা উন্নত চিকিৎসাসেবা পেয়েছিলেন। ভাঙা হাড়গুলো নিখুঁতভাবে জোড়া লাগার প্রমাণ মিলেছে এবং কোথাও সংক্রমণ বা বিকৃতভাবে জোড়া লাগার চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এটি প্রায় চার হাজার বছর আগেই প্রাচীন মিসরে উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার অস্তিত্বেরও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।
গবেষকদের ভাষ্য, সমাধির ধনসম্পদের তুলনায় মানুষের কঙ্কাল অতীতের জীবনযাপন, স্বাস্থ্য, দৈনন্দিন অভ্যাস এবং সামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য দেয়। নতুন এই গবেষণা প্রাচীন মিসরের রাজপরিবারের নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকেও নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ করে দিয়েছে।