ব্রিটিশ আমল থেকে ঝালকাঠির লবণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুনাম অর্জন করেছে। তবে বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন জেলার ঐতিহ্যবাহী লবণকলের মালিকরা। আর্থিক সংকট ও আধুনিকায়নের অভাবে চলতি বছর পশ্চিম ঝালকাঠির অন্তত ১৩টি লবণকল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন কয়েকশ শ্রমিক।
একসময় এসব মিল থেকে বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার পরিশোধিত লবণ উৎপাদন হতো। কিন্তু মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
লোকসানের কারণ সম্পর্কে মিল মালিকরা জানান, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বড় কোম্পানিগুলো শিল্পকারখানার কাঁচামালের নামে চীন থেকে সোডিয়াম লবণ আমদানি করে বাজারজাত করছে। তাদের দাবি, দেখতে আকর্ষণীয় হলেও এ ধরনের সোডিয়াম লবণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
দক্ষিণাঞ্চলের জেলা ঝালকাঠি শহরের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বাসন্ডা নদী। এই নদীর দুই তীর ঘিরেই একসময় গড়ে উঠেছিল ২০টিরও বেশি সনাতন পদ্ধতির লবণকল। নৌপথে সহজ যোগাযোগব্যবস্থা থাকায় পাকিস্তান আমলে এখানকার লবণ ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটে। কক্সবাজার থেকে নৌপথে কাঁচা লবণ এনে স্থানীয় শ্রমিকদের মাধ্যমে তা পরিশোধন, আয়োডিন মিশ্রণ এবং বাজারজাত করা হতো।
ব্যবসায়ীরা জানান, প্রয়োজনীয় ব্যাংকঋণ না পাওয়ায় তারা মিলগুলো আধুনিকায়ন করতে পারছেন না। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
একসময়ের প্রায় অর্ধশত লবণকলের মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে মাত্র সাতটি। শরীফ সল্ট, নিউ ঝালকাঠি সল্ট, আজাদ সল্ট ও ধানসিঁড়ি সল্টসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখনও উৎপাদন চালিয়ে গেলেও মিতালী, নূর, কুমিল্লা, মদিনা, মিনি ও সুরভী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজসহ অন্তত ১৫টি মিল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।
ব্রিটিশ আমল থেকে ঝালকাঠির লবণ বৃহত্তর ফরিদপুর, খুলনা, রাজশাহী, বরগুনা, ভোলা, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হতো। লবণ উৎপাদনকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটায় একসময় ঝালকাঠিকে ‘দ্বিতীয় কলকাতা’ বলেও অভিহিত করা হতো।
বর্তমানে বড় কোম্পানিগুলোর সোডিয়াম লবণ প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হলেও দেশীয় পদ্ধতিতে উৎপাদিত ঝালকাঠির লবণ প্রতি কেজি ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে।
জেলা শিল্প কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. আল আমিন বলেন, লবণের মান বজায় রাখতে নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন করা হয়। পাশাপাশি সনাতন পদ্ধতির মিলগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।
বর্তমানে ঝালকাঠির লবণ শিল্পের সঙ্গে প্রায় দুই হাজার শ্রমিক জড়িত। ব্যবসায়ীদের মতে, সরকারি প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন নিশ্চিত করা গেলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।