টানা তিন দিনের থেমে থেমে ভারী বর্ষণ এবং উজানে ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার সোমেশ্বরী ও মহারশী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে উপজেলা সদর বাজার, নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রাম ও বিলাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানির তীব্র স্রোতে নদীর তীরবর্তী ছয়টি সবজি ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি একটি বসতঘরের ভিটা ভেঙে গেছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরের পর মহারশী নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে নদীর পূর্বের ভেঙে যাওয়া অংশ দিয়ে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। এতে ঝিনাইগাতী সদর বাজারের বিভিন্ন এলাকা ও নদীর পাশের বসতবাড়ি গুলোতে পানি ঢুকে পড়ে।
উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের সবজি গ্রাম হিসেবে পরিচিত সন্ধ্যাকুড়া-গোমড়া এলাকায় মহারশী নদীর পানি উপচে সবজি ক্ষেতের মধ্য দিয়ে বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আরও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গোমড়া গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, “এই এলাকার কৃষকেরা সবজি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। পাহাড়ি ঢলের পানিতে আমাদের ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। নদীর ভাঙনে জমি হারানোর আশঙ্কায় আছি। কৃষকদের রক্ষা করতে হলে নদীর স্থায়ী সমাধান জরুরি।”
এদিকে মহারশী নদীর পাশাপাশি সোমেশ্বরী ও পাগলা নদীর পানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। ধানশাইল ইউনিয়নের বাগের ভিটা, কাংশা ইউনিয়নের কাড়াগাঁও ব্রিজ এলাকা হয়ে দক্ষিণ দাড়িয়ারপাড় ও সারিকালীনগর ধলীবিল এলাকায় পানি প্রবেশ করছে।
স্থানীয়রা জানান, সারিকালীনগর গ্রামের ধলীবিল দীর্ঘদিন ধরে খনন না হওয়ায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢলেই ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সড়ক ও বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘদিন জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
সারিকালীনগর গ্রামের ৯৩ বছর বয়সী বৃদ্ধ কাশেম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের আগ থেকেই আমার বাড়ি এখানে। শুরু থেকেই রাস্তাঘাট আর বিদ্যুৎ ছাড়াই কুপি বাতি দিয়েই জীবন পার করতেছি। একটু বৃষ্টি হলেই বাড়িতে পানি উঠে যায়। কলাগাছের ভেলা ছাড়া বাইরে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সারিকালীনগর ধলীবিলের বিষয়ে তরুণ স্বেচ্ছাসেবী ও সাংবাদিক শান্ত শিফাত বলেন, ধলীবিল এলাকার মানুষের দুর্ভোগ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিলের খাল ও পানি নিষ্কাশনের পথ স্বাভাবিক না থাকায় প্রতিবছর বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একদিকে ফসল নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে রাস্তাঘাট ও বসতবাড়িতে পানি উঠে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে। এই এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কমাতে ধলীবিলের খাল পুনঃখনন ও পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
এদিকে পার্শ্ববর্তী নালিতাবাড়ী উপজেলায় ভোগাই ও চেল্লাখালী নদীর পানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব নদীর পানি প্রবেশ করে কয়েকটি নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া শ্রীবরদী উপজেলার রানীশিমুল ইউনিয়নের চক্রপুর, বড়ইকুচি, হাতিরবরসহ কয়েকটি গ্রামেও পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবেশ করেছে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, আকস্মিক বন্যার কারণে নদী তীরবর্তী কৃষি জমিতে ভাঙন হচ্ছে। বন্যার পানির সঙ্গে আসা পলি জমে অনেক ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতি বছর সবজি ও ধানের জমিতেও এর প্রভাব পড়ছে। কৃষকদের রক্ষা করতে হলে নদীগুলো খননের পাশাপাশি খাল পুনঃখনন করা প্রয়োজন।
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল আমিন বলেন, ভারতের উজানে ভারী বর্ষণে পাহাড়ি নদীগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। দীর্ঘকাল খনন না হওয়ায় নদীগুলোর গভীরতা কমে গেছে। মহারশী নদীর স্থায়ী বেড়িবাঁধ না থাকায় সদর বাজার ও নদীর পাশের এলাকাগুলোতে পানি প্রবেশ করছে।
তিনি আরও বলেন, নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খনন এবং মহারশী নদীর স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য জনাব মাহমুদুল হক রুবেল মহোদয় তুলে ধরেছেন- যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছরের বন্যা ও নদীভাঙন থেকে রক্ষা পেতে দ্রুত মহারশি নদীর স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী-খাল খনন এবং পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।