আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতি লাখো মানুষের শেষ শ্রদ্ধা ও শোকাবহ বিদায়ের মধ্য দিয়ে ইরানের ধর্মীয় নগরী মাশহাদে সম্পন্ন হয়েছে তার দাফন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, কঠোর নিরাপত্তা এবং আবেগঘন পরিবেশে অনুষ্ঠিত শেষকৃত্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ ছাড়াও বিদেশি প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার গভীর রাতে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে হযরত ইমাম রেজা মাজার প্রাঙ্গণে তাকে দাফন করা হয়।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ লিখেছে, সেদিন বিকালে খামেনির কফিন ইরাক থেকে মাশহাদে পৌঁছায়। তখন সারা ইরান ও বিশ্বের ডজন খানেক দেশ থেকে আগতরা সেখানে জনসমুদ্রে রূপ নেয়।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শেষ পর্বে উপস্থিত ছিলেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ, ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি এজেয়ি, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবের, মাশহাদের জুমার নামাজের ইমাম আয়াতুল্লাহ আহমাদ আলামোল-হোদাসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা।
তাসনিম লিখেছে, দাফনের আগে মাজার প্রাঙ্গণে খামেনির শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ নামাজ পরিচালনা করেন তার ছেলে মোস্তফা খামেনি। প্রয়াতকে মাজারের ‘দার আল-দিকর রাওয়াক’ হলওয়েতে দাফন করা হয়েছে বলে খবরে বলা হয়েছে।
খামেনির দাফন ঘিরে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই মাশহাদে রাস্তায় লাখো মানুষের ঢল নামে। মরদেহের কফিন আসার অপেক্ষায় থাকা ক্ষুব্ধ জনতা ট্রাম্পের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
মিছিলে অংশ নেওয়া নারীদের হাতে ‘ট্রাম্পকে হত্যা কর’ লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। তারা স্লোগান দেয়, সর্বোচ্চ নেতার রক্তের কসম, ট্রাম্প, আমরা আপনাকে মেরেই ছাড়ব।
সমবেত পুরুষদের পরনে দেখা গেছে কালো শার্ট এবং নারীরা কালো চাদর পরে ছিলেন। অনেকের হাতেই ছিল শিয়া ঐতিহ্যের লাল পতাকা, যা সাধারণত হত্যাকাণ্ডের ‘প্রতিশোধ’ বা ‘রক্তের বদলা’ নেওয়ার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হয়।
মাশহাদের এক বাসিন্দা বলেন, এখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের চোখে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। আলোচনার টেবিলে কী চলছে বা সরকারের নীতি কী তা আমরা জানি না। আমরা সবাই লাল পতাকা হাতে পথে নেমেছি কেবল প্রতিশোধের দাবিতে।
তাসনিম লিখেছে, খামেনির মরদেহ মাশহাদে পৌঁছানোর আগে ইরাকে নজিরবিহীন জানাজা সম্পন্ন হয়। আরবাঈনের পথ ধরে কফিন কারবালায় নিয়ে যাওয়ার আগে নাজাফে ইমাম আলীর মাজারের চারপাশে আনুমানিক ৩৮ লাখ মানুষ বিশাল বিদায় মিছিলে সমবেত হন।
ইরাকি ধর্মীয় পণ্ডিতদের অনুরোধে মরদেহ ইরাকে নিয়ে যাওয়ার আগে ইরানের তেহরান এবং কোমে বড় আকারের বিদায় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে লাখ লাখ ইরানি আয়াতুল্লাহ খামেনির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার শুরুতে নিজ বাসভবনে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য। মার্চে শেষকৃত্য আয়োজনের পরিকল্পনা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকায় তা স্থগিত করা হয়।
গত শুক্রবার ইরানজুড়ে শুরু হয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সপ্তাহব্যাপী আনুষ্ঠানিকতা। সেদিন বিভিন্ন দেশের নেতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এর পরের দুই দিন তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মুসাল্লায় শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দেন লাখ লাখ শোকার্ত মানুষ। সেখানে কোরআন তিলাওয়াত, শোকগাঁথা আর প্রতিশোধের অঙ্গীকারে ইরানিদের অবিচল লড়াইয়ের সংকল্প ফুটে ওঠে।
এর মধ্যে রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার বাকের কলিবফের উপস্থিতিতে খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের জানাজা হয়।
এরপর সোমবার রাজধানী তেহরানে হয় প্রধান শোকযাত্রা; সেখানে ভোর থেকেই বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। পরদিন শোকযাত্রা হয় কোম নগরে। বুধবার খামেনির কফিন নেওয়া হয় প্রতিবেশী দেশ ইরাকে।