কার্বন ক্রেডিটে বিনিয়োগে দেশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ

সুমন হাওলাদার

জাতীয়

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। অথচ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে দেশের অবদান এক শতাংশেরও কম। এই বাস্তবতায়

2026-07-09T12:07:10+00:00
2026-07-09T12:07:10+00:00
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
কার্বন ক্রেডিটে বিনিয়োগে দেশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ
সুমন হাওলাদার
বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ১২:০৭ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। অথচ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে দেশের অবদান এক শতাংশেরও কম। এই বাস্তবতায় জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি নতুন আয়ের উৎস হিসেবে সামনে এসেছে কার্বন ক্রেডিট। বাংলাদেশের কার্বন মার্কেটে আগ্রহ বাড়ছে দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোর। বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে বনায়ন, কৃষি ও জ্বালানি খাতে। ইতোমধ্যে দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

সরকার মনে করছে, সঠিক নীতি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা গেলে কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করে বাংলাদেশ প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে। এজন্য আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। 

কার্বন ক্রেডিট হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশ নির্দিষ্ট পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড বা অন্য গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে পারলে তার স্বীকৃতি হিসেবে কার্বন ক্রেডিট পায়। সাধারণভাবে এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমপরিমাণ গ্যাস কমানো বা শোষণের জন্য একটি কার্বন ক্রেডিট দেওয়া হয়। পরে এই ক্রেডিট আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা যায়। উন্নত দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের নির্ধারিত নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এসব ক্রেডিট কিনে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের বন, কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ইটভাটা আধুনিকীকরণ, সৌরবিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস এবং পরিচ্ছন্ন রান্নার চুলা সব ক্ষেত্রেই কার্বন ক্রেডিট তৈরির সুযোগ রয়েছে। এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে জলবায়ু সুরক্ষার পাশাপাশি নতুন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথও খুলবে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে খুব বেশি সক্রিয় নয়। তবে সরকার জাতীয় কার্বন মার্কেট কাঠামো নিয়ে কাজ করছে।

জানা গেছে, প্যারিস চুক্তির আর্টিকেল-৬ এর আওতায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে অংশ নেবে। এ জন্য একটি জাতীয় রেজিস্ট্রি তৈরি করা হবে। সেখানে দেশের সব কার্বন ক্রেডিট প্রকল্পের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। এতে একই কার্বন ক্রেডিট একাধিকবার বিক্রির ঝুঁকি থাকবে না এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে। এখানে শুধু বন সংরক্ষণ করলেই হবে না। 

কার্বন ক্রেডিট পেতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে প্রকল্পের কারণে বাস্তবেই কার্বন নিঃসরণ কমেছে অথবা অতিরিক্ত কার্বন শোষিত হয়েছে। এজন্য আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পরিমাপ, যাচাই ও নিবন্ধনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ কাজই সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ।

বন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন উপকূলে জেগে উঠা স্থলভাগে বনায়নের জন্য বন বিভাগের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের প্রস্তাব দিয়েছে সহ বিনিয়োগ আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশি েিবিদশি অনেক প্রতিষ্ঠান। 

এগুলোর মধ্যে হলো- ইকোসোশ্যাল সলিউশনস, ভ্যালু নেচার ভ্যানচার, বাংলাদেশ বন্ধু ফাউন্ডেশন, আরণ্যক ফাউন্ডেশন, মাটি অর্গানিক লিমিটেড ও ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং। 

এ ছাড়াও  অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠান এটিইসি, দক্ষিণ কোরিয়ার ইডব্লিউসি, জাপানের মিটসুই ও সুমিটোমা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। উপকূলীয় বনায়নের কারণে বাংলাদেশের বিদ্যমান ভূমির সঙ্গে ৫ বছরের মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার হেক্টর নতুন ভূমির সৃষ্টি হবে। উপকূলের এসব নতুন ভূমিতে আগ্রহী কোম্পানিগুলো বনায়নের মাধ্যমে কার্বন ট্রেডিংয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন বিভাগের বন অধিদপ্তরের এক কমকর্তা বলেন, বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কার্বন ট্রেডিংয়ে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। তারা বনায়নের মাধ্যমে কার্বন ট্রেডিং করতে চায়। দুটি মডেলে এ বিনিয়োগ হবে। একটা সরাসরি বিনিয়োগ, আরেকটি সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্বে (পিপিপি) বিনিয়োগ।

জানাগেছে, কার্বন ট্রেডিংসংক্রান্ত নীতি নির্ধারণ ও এসব প্রকল্পের অনুমোদন প্রদানে সরকার ডেজিগনেটেড ন্যাশনাল অথরিটি (ডিএনএ) নামে একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করে গত বছরের জুনে। এটি কাজ করছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। আর আমাদের কার্বন নির্গমনে  অবদান ০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। কার্বন ট্রেডিং হলো কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর একটি বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা। 

এই ব্যবস্থায় সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থা নির্ধারণ করে দেয় কোনো দেশ, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি সর্বোচ্চ কতটুকু কার্বন নির্গমন করতে পারবে। নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি কার্বন নির্গমন করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বাজার থেকে কার্বন ক্রেডিট কিনতে হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে প্রথম কার্বন ট্রেডিং করেছিল সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। ২০০৬ সালে তারা সোলার হোম সিস্টেম ও উন্নত চুলা থেকে এ কার্বন ক্রেডিট তৈরি করে আয় করেছিল ১৭০ কোটি টাকা। 

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে আর কোনো কার্বন ট্রেডিং হয়নি। যে ফ্রেমওয়ার্কের (কিয়োটো প্রটোকল) আওতায় কার্বন ট্রেডিং হতো, সেটার মেয়াদ শেষ হয়ে যায় ২০২০ সালে। ২০২৪ সালে প্যারিস চুক্তির আর্টিকেল-৬ গৃহীত হলে আবার কার্বন ট্রেডিংয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়। বর্তমানে দুটি কার্বন মার্কেট রয়েছে। একটি হলো কমপ্লায়েন্স কার্বন মার্কেট, অন্যটি ভলান্টারি কার্বন মার্কেট। 

কমপ্লায়েন্স কার্বন মার্কেট হলো, যেখানে কোনো দেশ কার্বন নির্গমনে অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থ হলে অন্য দেশের কাছ থেকে কার্বন ক্রেডিট কিনে সেটা পুষিয়ে দেয়। ভলান্টারি কার্বন মার্কেট হলো যেখানে কোম্পানিগুলো পরিবেশবান্ধব হিসেবে ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে দূষণের সমপরিমাণ কার্বন ক্রেডিট কিনে নেয়।

পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু অর্থায়ন প্রত্যাশার তুলনায় কম আসছে। ফলে কার্বন ক্রেডিট বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থায়নের একটি বড় সুযোগ হতে পারে। তবে তাড়াহুড়া করে প্রকল্প অনুমোদন দিলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। 

তাই স্বচ্ছতা, সঠিক তথ্য এবং কঠোর তদারকির ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।সরকারের সাম্প্রতিক পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিল্প, পরিবহন, বন, কৃষি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় কার্বন বাজার পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও চলছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন শাখার পরিচালক মির্জা শওকত আলী বলেন, আমরা কার্বন ট্রেডিং ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে কাজ করছি। 

আমরা যে পরিকল্পনা জমা দিয়েছি, সেখানে কার্বন ট্রেডিংয়ে আমরা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছি। আমাদের যে এনডিসির লক্ষ্যমাত্রা, সেটির ৪০ থেকে ৫০ পার্সেন্ট কার্বন ট্রেডিং থেকে পূরণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। 

তিনি আরো বলেন, জাপানি প্রতিষ্ঠান মিটসুই কৃষি খাতে অতিরিক্ত পানির ব্যবহার বন্ধে ২ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং পদ্ধতির একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। 

এ পদ্ধতিতে কম পানি ব্যবহার করে উৎপাদন ১০ শতাংশ বাড়ানো যায় এবং মিথেন গ্যাসের নির্গমন কমানো যায়। অন্যদিকে সুমিটোমো গ্যাস লাইনের লিকেজ বন্ধ করে মিথেন গ্যাসের নির্গমন কমাতে চায়। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার এটিইসি ও কোরিয়ার ইডব্লিউসি রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের পরিবর্তে ক্লিন কুকিং স্টোভের ব্যবহার বাড়ানোর প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়।

কার্বন ক্রেডিটে বড় শক্তি হতেপারে  কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত  : কার্বন ক্রেডিট থেকে আয় বাড়াতে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদকে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। 

কারণ, বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনো কৃষির সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে রয়েছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, জলাভূমি, উপকূল, হাওর, বনাঞ্চল এবং সমৃদ্ধ মৎস্যসম্পদ। সঠিক পরিকল্পনা নেওয়া গেলে এসব খাত থেকেই বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং কার্বন শোষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ধান চাষে মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ কমানো, সুষম সার ব্যবহার, জৈব সার প্রয়োগ, সংরক্ষণশীল চাষাবাদ, ফসলের অবশিষ্টাংশ না পোড়ানো এবং সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন কমানো সম্ভব। 

এসব কার্যক্রম আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই করা গেলে কার্বন ক্রেডিট পাওয়া যাবে।কৃষি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে স্মার্ট কৃষি, মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন, জৈব সার ব্যবহার, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং জলবায়ু-সহনশীল ফসলের সম্প্রসারণে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। যদিও এসব প্রকল্প সরাসরি কার্বন ক্রেডিটের জন্য নয়, তবে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় টেকসই মৎস্য আহরণ, জলাভূমি সংরক্ষণ, বায়োফ্লক প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব খামার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ চলছে। 

এছাড়াও সমুদ্রের উপকূলীয় বন, সি-গ্রাস এবং জলাভূমি প্রচুর পরিমাণ কার্বন শোষণ করে। এগুলো সংরক্ষণ করলে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে ক্রেডিট পাওয়া যেতে পারে।। তবে এখনো কার্বন ক্রেডিট অর্জনের জন্য আলাদা কোনো জাতীয় প্রকল্প চালু হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ খাতে দ্রুত নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।প্রাণিসম্পদ খাতেও নতুন সুযোগ রয়েছে। 

গবাদিপশুর বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন, গোবর থেকে জৈব সার তৈরি, খামারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার এবং উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ কমানো সম্ভব। এসব উদ্যোগ কার্বন ক্রেডিট প্রকল্প হিসেবে নিবন্ধিত হলে খামারিরাও অতিরিক্ত আয় করতে পারবেন।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে লাখ লাখ ক্ষুদ্র কৃষক রয়েছেন। 

একজন কৃষকের জমি থেকে খুব বেশি কার্বন ক্রেডিট তৈরি না হলেও হাজার হাজার কৃষককে একত্র করে বড় প্রকল্প তৈরি করা সম্ভব। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে অংশ নেওয়া সহজ হবে। এজন্য সমবায়ভিত্তিক বা ক্লাস্টারভিত্তিক উদ্যোগ প্রয়োজন।বাংলাদেশে কার্বন ক্রেডিট নিয়ে ইতোমধ্যে কয়েকটি গবেষণা হয়েছে।

সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের আগে শক্তিশালী আইন, নির্ভুল তথ্যভান্ডার এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ প্রত্যাশিত সুবিধা পাবে না। গবেষণায় দক্ষ জনবল তৈরি এবং নির্ভরযোগ্য কার্বন পরিমাপ ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারফভশন অব ন্যাচার (আইইউসিএন) এবং উন্নয়ন সহযোগী কয়েকটি সংস্থাও বাংলাদেশে বন, জলাভূমি ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রকে কেন্দ্র করে কার্বন বাজারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। তাদের মতে, প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন—দুটি লক্ষ্যই একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব।

 বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়,  ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত কপ-৩০-এ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার পর স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) অনেক বাণিজ্যিক সুবিধা ধীরে ধীরে কমে যাবে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে। একই সঙ্গে ইউরোপসহ বিভিন্ন বাজারে পণ্যের পরিবেশগত মান, কার্বন নিঃসরণ এবং সবুজ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব বাড়বে। 

এ অবস্থায় কার্বন ক্রেডিট এবং কম-কার্বন উৎপাদন ব্যবস্থা বাংলাদেশের শিল্পের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠান বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। এতে রপ্তানি বাজার ধরে রাখা সহজ হতে পারে। ব্যবসায়িক নেতাদের মতে, তৈরি পোশাক, চামড়া, সিরামিক, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন শিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

বিএনপি চেয়ারপারসনের ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি কমিটির বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, বর্তমান সরকার ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা দেখেছি যে, এই প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতিবছর প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পেতে পারি শুধুমাত্র গাছ লাগানোর মাধ্যমে কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করে। এটি একদিকে পরিবেশের জন্য উপকারী, তাপমাত্রা কমবে, বৃষ্টিপাত বাড়বে, মাটির গুণগত মান উন্নত হবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় সুযোগ তৈরি করবে।  

দেখা গেছে, ম্যানগ্রোভ গাছ পরিবেশ থেকে সবচেয়ে বেশি কার্বন শোষণ করে। এই বিবেচনায় উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মেঘনা অববাহিকা, হাতিয়াসহ উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকায় নতুন জেগে ওঠা চর রয়েছে, যেখানে এখনো কোনো গাছপালা নেই। সুন্দরবন থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত, বিশেষ করে মেঘনা অববাহিকায় হাজার হাজার হেক্টর নতুন ভূমি তৈরি হয়েছে। সেখানে বনায়ন করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার শুধু খরচ কমায় না, বরং কার্বন ক্রেডিট বিক্রির মাধ্যমে অতিরিক্ত আয়ও নিশ্চিত করতে পারে। যদিও বাংলাদেশে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ কার্বন ট্রেডিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, তবে সঠিক কাঠামো তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এ ক্রেডিট বিক্রি করা সম্ভব হবে। 

বাংলাদেশের শিল্প খাত বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ প্যারিস চুক্তির আওতায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 

এ লক্ষ্যে কার্বন ক্রেডিট বাণিজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। কার্বন ক্রেডিট এমন একটি আর্থিক প্রক্রিয়া, যা শিল্প প্রতিষ্ঠানকে তাদের কার্বন নিঃসরণ ভারসাম্য করতে সাহায্য করে।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কার্বন বাজার দ্রুত বড় হচ্ছে। ২০২৩-২৪ সালের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে এসে বৈশ্বিক কার্বন মূল্য নির্ধারণ বাজার থেকে আয় দাঁড়িয়েছে ১০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ বেশি।বর্তমানে এই বাজারের মোট সক্ষমতা প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার। 

ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই বাজার এক ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারে পৌঁছাবে, যেখানে মূল বিনিয়োগ আসবে বেসরকারি খাত থেকে।


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: