অন্য সব খাতের মতো ক্রমশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর হয়ে উঠছে শিক্ষাব্যবস্থা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও ঝুঁঁকছে এআইতে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন শিক্ষার্থীদের হাতের মুঠোয়।
কোনো তথ্য জানতে, সহজ কিংবা জটিল প্রশ্নের উত্তর বের করার মতো বিভিন্ন কাজে ‘চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ডিপসিক, গ্রকের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। সহজে উত্তর পেয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রবন্ধ না পড়েই শুধু সারসংক্ষেপ কিংবা গাণিতিক সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি না বুঝে উত্তর মুখস্থ করছে। যা তাদের মেধার স্বাভাবিক বিকাশ ও একাডেমিক সততাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
জানা যায়, এআই আজ আর গবেষণা ল্যাবের কৌতূহলের বিষয় নয়; এটি বাস্তব জীবনের অংশে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই দ্রুত রোগ শনাক্তে সহায়তা করছে। কৃষিক্ষেত্রে ফসলের রোগ ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতেও এআই ব্যবহার হচ্ছে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও স্মার্ট টিউটর প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে ব্যক্তিভিত্তিক শিক্ষার পথনির্দেশ দিচ্ছে। কিন্তু এআইয়ের এ অগ্রযাত্রার পাশাপাশি নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। অ্যালগরিদম যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয় বা ভুল সিদ্ধান্ত নেয়, তার ভুক্তভোগী হবে মানুষ। তাই প্রযুক্তির সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহারে নজর দেয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই ব্যবহারে নীতিমালার অভাব, বাড়ছে ঝুঁঁকি ও বিভ্রান্তিকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের বিপরীতে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর অভাবে বিশ্বব্যাপী ঝুঁকি ও বিভ্রান্তি ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে ডিপফেক, ভুয়া তথ্য ও সাইবার হামলার মতো বিষয়গুলো জননিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের (সিএসি) অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল তথ্যের জোগান দেয়। তবে তা কখনোই প্রকৃত শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক যৌক্তিক চিন্তাভাবনা এবং মানুষের নিজস্ব প্রচেষ্টার বিকল্প হতে পারে না। তিনি বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে এআই দ্বিমুখী প্রভাব ফেলছে। প্রচলিত পাঠ্যক্রমের বাইরে গিয়ে উন্নত জ্ঞান অর্জনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম এআই।
এআই ব্যবহারে দেশের শিক্ষার্থীরা কতটা নির্ভরশীল জানতে কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অ্যাসাইনমেন্ট, কুইজ, কোনো গাণিতিক সমস্যা, কোনো বইয়ের শুধু সারসংক্ষেপ জানতে, ইতিহাসের কোনো ঘটনা সহজে জানতে ও বুঝতে, সহজে যেকোনো জটিল প্রশ্নের উত্তর জানতে এআই ব্যবহার করছেন তারা।
বই পড়ার কথা জানতে চাইলে শিক্ষার্থীরা বলেন, বই থেকে কোনো তথ্য সহজে পাওয়া যায় না। অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। তাই বইয়ের বদলে বিভিন্ন এআই ব্যবহার করেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা রিসার্চের কাজেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছেন।
এছাড়া অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, শুধু উত্তর বের করার জন্য তারা এআই ব্যবহার করেন না। কোনো জটিল সমস্যার সমাধান বের করতে কিংবা সমাধান বের করার প্রক্রিয়া জানতে তারা বিস্তারিত পড়ে থাকেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শিক্ষাক্ষেত্রে যুগে যুগে বিভিন্ন প্রযুক্তি বিপ্লব বয়ে এনেছে এবং আনছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন শিক্ষাক্ষেত্রে এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সেখানে বাংলাদেশেরও বসে থাকার সুযোগ নেই।
এআই এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষাস্তরে ব্যবহারের নীতিগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা এই প্রযুক্তি সম্পর্কে জানবে এবং পরবর্তী ধাপে এর ব্যবহার শুরু করবে। অতঃপর শিক্ষাক্রমে এআইকে প্রাধান্য দিয়ে সে অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে জোর দিতে হবে।
তবে এটাও ঠিক, যতো বেশি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি তত বেশি সমস্যা- এমন একটা কথা প্রচলিত আছে! পৃথিবীতে প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে সময়ের পরিক্রমায় ডিজিটাল প্রতারণাও বাড়ছে। তাই বলে তো আর প্রযুক্তি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা যায় না! এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় কথা শোনা যাচ্ছে।
তবে শিক্ষকরা মনে করছেন, একটা প্রযুক্তি শতভাগ খাঁটি হতে পারে না। ব্যবহারের ধরনের ওপর ভালোমন্দ নির্ভর করে। প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে।
এআই-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দ্বারা শিক্ষককে প্রতারিত করা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অন্যের লেখা প্লেজারিজমের মাধ্যমে চালিয়ে দেয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন, পক্ষপাত, ডিজিটাল প্রতারণা, অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বিষয়টি এখন ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা, মানবিকতা, মূল্যবোধ প্রভাবিত করার ভয় তো রয়েছেই!
সবচেয়ে বেশি ভয় হচ্ছে শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা ওপর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে। বর্তমানে নৈতিকতার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। যাহোক এআই আর ভবিষ্যৎ কল্পনা নয়, এখন বাস্তব হাতিয়ার। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তির প্রভাব সবচেয়ে বেশি বেগে পৌঁছে যায় সবখানে।
বাংলাদেশে এই মুহূর্তে দরকার এআই ব্যবহারের নীতিমালার দিকে নজর দেয়া ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আইসিটিভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণ ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে নজর দিতে হবে। এআই নিয়ে এখনই না ভাবলে শিক্ষাক্ষেত্রে ও কর্মসংস্থানে বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ব্যর্থ হবে।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. বিজয় লাল বসু বলেন, শিক্ষার্থীদের মাঝে বই কিংবা দীর্ঘ প্রবন্ধ পড়তে অনীহা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নির্ভরতা বাড়ার কারণে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে তেমন মনোযোগ দেয় না। যেখানে তাদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা করা দরকার সেটা তারা করতে পারছে না। অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা রিসার্চের কাজগুলো নিজেরা চিন্তাভাবনা না করে এআই দিয়ে লিখিয়ে নিচ্ছে।
তিনি বলেন, সব শিক্ষার্থীই যে এআইয়ের ওপর অতিনির্ভরশীল এমন নয়, অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা এআই-কে টুল বা সহকারী হিসেবে ব্যবহার করে। তাদের এআই ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় অতিনির্ভরশীল তাদের জন্য ক্ষতিকর।