ঢাকার অদূরে সাভারে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’পরবর্তী সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
এ ঘটনায় এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান নাহিদের বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’ হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন।
সোমবার রাতে সাভারের তারাপুর ঈদগাহ মাঠ এলাকায় এনসিপির সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণে অন্তত চারজন আহত হন। ঘটনার পরপরই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সোমবার রাত ১১টার দিকে সাভার মডেল থানায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, এ ধরনের ঘটনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতারও প্রতিফলন।
তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটা মানেই পুলিশের ব্যর্থতা। পুলিশকে দলীয়ভাবে পরিচালিত করা হলে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা গেলে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছে কি না, সেটিও স্পষ্ট হবে।
তবে নাহিদ ইসলামের এ মন্তব্যের বিষয়ে মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিক্রিয়া জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, গতকালের ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা এর নিন্দা জানাই। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা যেটিকে রাজনৈতিক বক্তব্য বলি, তিনি সে ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সেটি বলার অধিকার তাঁর আছে। তবে তাঁর মতো একজন দায়িত্বশীল নেতার কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল মন্তব্য প্রত্যাশা করি।
এদিকে ঘটনার পর বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়েছে। সোমবার দিবাগত রাতে এনসিপির ঢাকা জেলা উত্তরের সদস্যসচিব মো. সালামত উল্লাহ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস ও ট্রাফিক উত্তর) মো. জাহাঙ্গীর আলম। মামলার এজাহারে বিস্ফোরণের পেছনে কোনো নিষিদ্ধ গোষ্ঠীর সংঘবদ্ধ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে সন্দেহভাজন হিসেবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের দুই নেতা-কর্মীকে আটক করে পরে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার পূর্ব ভাকুম গ্রামের মো. নুরুল ইসলাম (৫২) এবং সাভার পৌর এলাকার আনন্দপুর মহল্লার মো. সজীব (৩২)। সাভার মডেল থানার ওসি (তদন্ত) নুর মোহাম্মদ জানান, ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রাজনৈতিক দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে এ ধরনের হামলা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির বহিঃপ্রকাশ। তিনি হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, সমাবেশ শুরুর সময় আকস্মিক বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এবং পরে মঞ্চের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা স্বাভাবিক নয়। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের উপস্থিতিতে আয়োজিত সমাবেশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে বিএনপি নেতা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনও ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সোমবার গভীর রাতে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এই ধরনের ঘটনা আমাদের রাজনীতির জন্য একটি কালো অধ্যায়। এ ধরনের সহিংসতা রাজনীতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। আর রাজনীতি ধ্বংস হলে দেশ ও জাতি চরম সংকটের মুখে পড়বে। তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
একই সঙ্গে তাঁর ভাষ্য, “যারা ফ্যাসিবাদী রাজনীতিতে বিশ্বাস করে এবং জনগণের পরিবর্তে অন্যের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়, তারাই এ ধরনের ঘটনার মাধ্যমে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করতে পারে।