চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০টির উন্নয়নকাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ছয়টির মধ্যে পাঁচটির কাজ ৯৮ শতাংশ এবং হিজড়া খালের কাজ ৬৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, চলতি বর্ষা মৌসুমে নগরের জলাবদ্ধতা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কমেছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রকল্পের সব কাজ শেষ হলে প্রকল্প এলাকার স্থায়ী জলাবদ্ধতার অবসান হবে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) চট্টগ্রাম মহানগরের বাকলিয়ার রাজাখালী আর্মি ক্যাম্পে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান চট্টগ্রাম জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক এবং সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহসিন।
তিনি জানান, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর খালগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ জন্য এক থেকে দুই বছর যৌথভাবে কাজ করবে সেনাবাহিনী ও সিটি করপোরেশন, যাতে কারিগরি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা হস্তান্তর করা যায়। একই সঙ্গে খাল ও ড্রেনে প্লাস্টিকসহ যেকোনো ধরনের বর্জ্য না ফেলার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয় সেনাবাহিনী। প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৩৬টি খালের উন্নয়ন, ১৬৩ কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, ১১৪টি ব্রিজ ও কালভার্ট, ছয়টি রেগুলেটর, ২১টি সিল্ট ট্র্যাপ, নতুন খাল খনন, ড্রেন সম্প্রসারণ এবং সড়ক নির্মাণ।
প্রকল্প পরিচালক জানান, বাকি পাঁচটি খালের কাজ ৯৮ শতাংশ শেষ হলেও আগাম বর্ষার কারণে কিছু ফিনিশিং কাজ বাকি রয়েছে। সেগুলো ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। অন্যদিকে হিজড়া খালের কাজের অগ্রগতি ৬৮ শতাংশ। বর্ষা মৌসুমে খননকাজ চালালে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে পুনরায় কাজ শুরু করে আগামী অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে অবশিষ্ট রিটেইনিং ওয়াল, ব্রিজ এবং তিনটি সিল্ট ট্র্যাপের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, হিজড়া খালের প্রস্থ সাড়ে তিন মিটার থেকে বাড়িয়ে নয় মিটার এবং গভীরতা আড়াই মিটার থেকে চার থেকে ছয় মিটার করা হচ্ছে। এ জন্য ১২৭টি স্থাপনা অপসারণের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে প্রায় ১২০টি ইতোমধ্যে অপসারণ করা হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যেই বাকি স্থাপনাগুলোও অপসারণের আশা করছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। কাজ শেষ হলে হিজড়া খালসংলগ্ন এলাকায় অতিবৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা হবে না বলে দাবি করা হয়।
সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিপাতের প্রসঙ্গ তুলে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহসিন বলেন, ৫ জুলাই থেকে মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত পতেঙ্গা ও আমবাগান আবহাওয়া উপকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ৫৪৬ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা গত ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ১৯৮৩ সালে সর্বোচ্চ ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি ৫০০ থেকে ৫৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের হিসাব ধরে নকশা করা হলেও এবারের বৃষ্টিপাত প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ছিল। এরপরও অধিকাংশ এলাকায় দ্রুত পানি নেমে গেছে। প্রবর্তক মোড়ে খাল পরিষ্কার করার পর সেখানে আর পানি জমেনি। তবে কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, মুরাদপুর বাসস্ট্যান্ডসহ কয়েকটি এলাকায় সাময়িকভাবে দুই থেকে আড়াই ফুট পানি জমেছিল। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই সেসব এলাকার পানি নেমে যায়। তিনি একে স্থায়ী জলাবদ্ধতা নয়, বরং অতিবৃষ্টিজনিত সাময়িক ‘ফ্ল্যাশ ওয়াটার’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম নগরে জলাবদ্ধতার স্থান ছিল ১২১টি, যেখানে পানি নামতে ৩৫ থেকে ৩৬ ঘণ্টা সময় লাগত। প্রকল্পের অগ্রগতির ফলে ২০২৪ সালে এ সংখ্যা কমে ৬১টিতে এবং ২০২৫ সালের শেষে ১৭টিতে নেমে আসে। বর্তমানে ওই ১৭টি স্থানের মধ্যে মাত্র চার থেকে পাঁচটি এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, গত ২৮ এপ্রিলের পর মঙ্গলবারের আগে কেবল তিনটি স্থানে—কাপাসগোলা ব্রিজের দুই পাশ, কাতালগঞ্জের নবপণ্ডিত বৌদ্ধবিহার এলাকা এবং জাতিসংঘ পার্কসংলগ্ন এলাকায়—সাময়িক পানি জমেছিল। কাপাসগোলা এলাকায় নতুন ব্রিজ নির্মাণ এবং বৌদ্ধবিহার ও কাতালগঞ্জ এলাকায় সড়ক দেড় থেকে দুই ফুট উঁচু করার সুপারিশ করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন এসব কাজ সম্পন্ন করলে ওই এলাকাগুলোতেও জলাবদ্ধতা থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহসিন বলেন, পুরোনো নগরের ভেতরে দখল হয়ে যাওয়া খাল পুনরুদ্ধার, জমি অধিগ্রহণ, স্থাপনা অপসারণ এবং স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ এগিয়ে নিতে হয়েছে। এসব বাস্তবতা প্রকল্প শুরুর সময় পুরোপুরি বিবেচনায় ছিল না। পরে সেনাবাহিনী দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থানীয়দের সহযোগিতায় ধাপে ধাপে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।