গ্রীষ্মের মৌসুম পেরিয়ে বর্ষার জুলাইয়েও কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার মাঠে দৃষ্টিনন্দন তরমুজের সমারোহ। আধুনিক মালচিং প্রযুক্তি, উন্নত জাতের ‘ব্ল্যাক কুইন’ বীজ এবং কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তায় অফ-সিজনে তরমুজ চাষ করে সফলতার নতুন দৃষ্টান্ত গড়েছেন চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের ঘাগড়া গ্রামের কৃষকেরা। বাম্পার ফলন, বাজারে চাহিদা এবং তুলনামূলক বেশি দামের কারণে এই ব্যতিক্রমী চাষে লাভের মুখ দেখছেন তারা।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু ঘাগড়া গ্রামেই প্রায় ৩০ জন কৃষক পাঁচ একরের বেশি জমিতে অফ-সিজনের ব্ল্যাক কুইন জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। মৌসুমের বাইরে উৎপাদিত হওয়ায় বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি তরমুজ প্রায় ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে অধিকাংশ কৃষকই খরচের তুলনায় কয়েকগুণ লাভের আশা করছেন।
সফল কৃষক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন জানান, গত বছরের পরীক্ষামূলক সাফল্যের পর এবার তিনি প্রায় ৮২ শতাংশ জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। এতে তার মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। তিনি আশা করছেন, ক্ষেত থেকেই প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হবে এবং সব খরচ বাদ দিয়ে দুই লাখ টাকার বেশি নিট মুনাফা অর্জন করবেন।
তিনি বলেন, বর্ষাকালে তরমুজ চাষ নিয়ে শুরুতে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তবে কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী মাচা তৈরি, মালচিং পেপার ব্যবহার এবং নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে ক্ষেত থেকেই তরমুজ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
বর্ষার অতিবৃষ্টি থেকে ফসল রক্ষায় কৃষকেরা মাচা তৈরি করে প্রতিটি তরমুজ বিশেষ জালের মাধ্যমে ঝুলিয়ে রেখেছেন। এতে ফল মাটিতে পড়ে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমেছে এবং ফলের গুণগত মানও বজায় থাকছে।
আলাউদ্দিনের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এলাকার অনেক কৃষক এবার ধানের পরিবর্তে তরমুজ চাষে ঝুঁকেছেন। তাদের ভাষ্য, প্রচলিত ফসলের তুলনায় এই চাষে লাভ অনেক বেশি এবং আগামী মৌসুমে আরও বড় পরিসরে চাষের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানায়, এবার ঘাগড়া গ্রামে প্রায় ৩০ জন কৃষক পাঁচ একরের বেশি জমিতে অসময়ের তরমুজ চাষ করেছেন। বাজারে প্রতি কেজি প্রায় ৫০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় উৎপাদন খরচের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে ধানের পরিবর্তে বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ চাষে আগ্রহ বাড়ছে স্থানীয় কৃষকদের।
ঘাগড়া ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম জানান, ‘ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় এলাকায় প্রথম প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়। কৃষি বিভাগের নিয়মিত তদারকি, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই দমনের পরামর্শ অনুসরণ করায় কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত ফলন পেয়েছেন।
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নূরে-আলম জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে অফ-সিজনের তরমুজ চাষ হয়েছে। প্রতি বিঘায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হলেও বিক্রি থেকে এক লাখ টাকার বেশি আয় সম্ভব হচ্ছে। মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ দিনের মধ্যে প্রতি বিঘায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট মুনাফা পাচ্ছেন কৃষকেরা।
তিনি আরও বলেন, বর্ষাকালে তরমুজ চাষের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ গাছের গোড়া পচা রোগ। এটি প্রতিরোধে মালচিং পেপার, উন্নত জাতের বীজ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত পরিচরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব প্রযুক্তির সফল প্রয়োগে রোগবালাই কমেছে এবং ফলন বেড়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনা দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। পাকুন্দিয়ার অসময়ের তরমুজ চাষ শুধু কৃষকদের আয় বাড়াচ্ছে না, বরং বাণিজ্যিক কৃষির একটি সফল মডেল হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছে।