বৃত্তাকার নৌ ও সড়কপথ বাস্তবায়নে ধীরগতি

সুমন হাওলাদার

জাতীয়

ঢাকার যানজট কমাতে বহু বছর ধরে দুটি বড় প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে সরকার। একটি বৃত্তাকার নৌপথ। অন্যটি বৃত্তাকার সড়কপথ বা

2026-07-06T11:44:50+00:00
2026-07-06T11:44:50+00:00
  সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬,
২২ আষাঢ় ১৪৩৩
 
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
বৃত্তাকার নৌ ও সড়কপথ বাস্তবায়নে ধীরগতি
সুমন হাওলাদার
সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ১১:৪৪ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ঢাকার যানজট কমাতে বহু বছর ধরে দুটি বড় প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে সরকার। একটি বৃত্তাকার নৌপথ। অন্যটি বৃত্তাকার সড়কপথ বা রিং রোড। দুটি প্রকল্পই বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত অনেক সহজ হবে। কমবে সময় ও পরিবহন ব্যয়। একই সঙ্গে কমবে যানজটের চাপ। তবে নানা কারণে দুটি প্রকল্পই এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। রয়েছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা। ফলে বাড়ছে নগরবাসীর দুর্দশা অন্যদিকে বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়ও।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক, নৌপথ ও গণপরিবহনকে একসঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে ঢাকার যানজট স্থায়ীভাবে কমানো সম্ভব নয়। ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১১০ থেকে ১১২ কিলোমিটার। এই নৌপথ ঘিরে রয়েছে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী। এর সঙ্গে টঙ্গী খালও যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই রুট চালু হলে রাজধানীর চারপাশে একটি পূর্ণাঙ্গ নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। বৃত্তাকার নৌপথ বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। 

নদী খনন, নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, তীর সংরক্ষণ, সীমানা নির্ধারণ, ওয়াকওয়ে নির্মাণ এবং নৌঘাট তৈরির কাজ করছে সংস্থাটি।সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী নদীর দুই তীরে প্রায় ২২০ কিলোমিটার সীমানা নির্ধারণ, প্রায় ৫২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, তীর সংরক্ষণ, আধুনিক জেটি এবং পরিবেশ উন্নয়নের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ছিল প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। 

অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত বৃত্তাকার নৌপথ উন্নয়নে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার প্রথম ধাপ এবং পুরো পরিকল্পনায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। তবে অগ্রগতি প্রত্যাশিত নয়। বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন অংশে খনন হলেও দখল, দূষণ, কম সেতুর উচ্চতা, অপরিকল্পিত স্থাপনা এবং সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাবে পুরো নৌপথ এখনো সচল হয়নি।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বৃত্তাকার সড়কপথ(সার্কুলার রিং রোড) এবং বৃত্তাকার নৌপথ চালুর বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই অবকাঠামোগত উন্নয়নগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজধানীতে যানবাহনের চাপ ও যানজট উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। 

বৃত্তাকার সড়ক (রিং রোড) চালু হলে ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-মাওয়া এবং ঢাকা-চট্টগ্রামগামী ভারী যানবাহনগুলোকে আর রাজধানীর ভেতরের সড়ক ব্যবহার করতে হবে না। ফলে শহরের ভেতরে যানবাহনের চাপ ও যানজট নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে। কেবল সড়ক পথের ওপর নির্ভর না করে, ঢাকাকে ঘিরে থাকা প্রায় ১১০ কিলোমিটার বৃত্তাকার নৌপথকেও সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার (ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম) আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এক্ষেত্রে বৃত্তাকার নৌপথে চলাচলকারী নৌযানগুলো সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত হওয়া উচিত।  

এতে একদিকে যেমন যানজট কমবে, অন্যদিকে পরিবেশদূষণ ও জ্বালানি সাশ্রয় হবে। এই বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বৃত্তাকার পথ ও পরিবেশবান্ধব নৌ-ব্যবস্থার কারিগরি দিকগুলো উন্নত এবং এটি সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াতের সময় অনেকাংশে বাঁচাবে।

অন্যদিকে রাজধানী ঘিরে ৮৫ কিলোমিটার বৃত্তাকার সড়কের (ইনার সার্কুলার সড়ক) গাবতলী-বাবুবাজার-কদমতলী অংশের ১২ কিলোমিটার নির্মাণ সবচেয়ে জরুরি হলেও কাজ খুব একটা এগোচ্ছে না। সড়কের অন্যান্য অংশ নিয়ে সমন্বয়হীনতা আছে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সেতু কর্তৃপক্ষের এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মধ্যে। প্রকল্প রাজধানীর যানজট কমানোর অন্যতম বড় উদ্যোগ। এর মাধ্যমে দূরপাল্লার যানবাহনকে শহরের ভেতরে না ঢুকিয়েই এক দিক থেকে অন্য দিকে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। 

বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গাবতলী-বাবুবাজার এবং পোস্তগোলা-ডেমরা সংযোগকারী অভ্যন্তরীণ রিং রোড। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ কিলোমিটার। এই অংশের বাস্তবায়ন কাজ এগিয়ে চলছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রকল্পের প্রায় ৪৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। রায়েরবাজার, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় নির্মাণকাজ চলছে।

এই সড়কপথের বাস্তবায়নে কাজ করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সংস্থাগুলো। ভবিষ্যতে এটি রাজধানীর বাইরের বৃহৎ রিং রোডের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।তবে এই প্রকল্পেও রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। সবচেয়ে বড় সমস্যা জমি অধিগ্রহণ। এছাড়া পুনর্বাসন, ইউটিলিটি স্থানান্তর, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ের অভাবের কারণে প্রকল্পের গতি ধীর হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে যানবাহনের চাপ কমাতে ঢাকাকে ঘিরে থাকা প্রায় ১১০ কিলোমিটার নদী পথে বৃত্তাকার নৌপথ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০০ সালে। এসময়ের পরে দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫ কিলোমিটরি নদী খনন করা হয়। এরই থারাবাহীকতায় সদরঘাট থেকে গাবতলী পর্যন্ত নৌপথে ২০০৪, ২০১০, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে চার দফা ওয়াটার বাস ও লঞ্চ নামানো হয়েছিল। তবে সব কটি অল্প দিন পর বন্ধ হয়ে যায়। 

মূলত ঢাকা ঘিরে থাকা চারটি নদীতে থাকা ১৩টি নিচু সেতু (বুড়িগঙ্গা প্রথম ও দ্বিতীয়, বসিলা, আমিন বাজার, বিরুলিয়া, ধৌড়, প্রত্যাশা, কামারপাড়া, আব্দুল্লাহপুর, টঙ্গীর রেলওয়ে, কায়েতপাড়া, ডেমরার সুলতানা কামাল ও কাঁচপুর সেতু)। 

তবে বুড়িগঙ্গা দুটি ও কাঁচপুর সেতু ছাড়া বাকিগুলোর নিচ দিয়ে বর্ষা মৌসুমে জাহাজ চলে না। এসব নিচুব্রীজ অপসারণে বিআইডব্লিউটিএর পক্ষে থেকে রেল ওসেতু মন্ত্রণালয়কে বেশ কয়কবার চিঠি দিলেও কার্যকরী কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েনি।

ঢাকায় বৃত্তাকার নৌপথ চালু বিষয়ে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. সামছুল হক বলেন, বৃত্তাকার নৌপথের প্রকল্পগুলো শুধু নৌযানের ওপর ভিত্তি করে খণ্ডিতভাবে নেওয়া হয়েছিল, যা সম্পূর্ণ ভুল। পৃথিবীর উন্নত দেশে নৌপথে নামার পর যাত্রীরা কোনো কষ্ট ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে অন্য কোনো গণপরিবহন (যেমন- বাস বা ট্রেন) পেয়ে যান, যা ঢাকায় অনুপস্থিত। 

সামগ্রিক ট্রানজিট সিস্টেমের সমন্বয় না থাকার কারণেই অতীতে এই উদ্যোগগুলো বারবার ব্যর্থ হয়েছে। তিনি আরো বলেন, রাজধানীর যানজটের জন্য দায়ী মাত্রাতিরিক্ত প্রাইভেটকার। মাত্র আট হাজার বাসের বিপরীতে আড়াই লাখ প্রাইভেটকারের দখলে ঢাকার রাজপথ। ফ্লাইওভারের কারণে প্রাইভেটকার দিন দিন আরও বাড়ছে। এমন প্রাইভেটকার ফ্লাইওভারের সুফলভোগী। ফ্লাইওভার যত বাড়বে, প্রাইভেটকার তত বাড়বে। রাজধানী বাসীকে ঢাকারবাইরে বের হতে হলে যানজট ফেলেই যেতে হবে। একারণেই বৃত্তাকার নৌ ও সড়কপথ বাস্তবায়ন সময়ের দাবি।

রাজধানীর যানজট নিরসনে হচ্ছে বৃত্তাকার সড়ক ও নৌপথ  রাজধানীর যানজট নিরসনে ইনার সার্কুলার রিং রোড (বৃত্তাকার সড়ক) নির্মাণ এবং ঢাকাকে ঘিরে থাকা নদীপথ কার্যকরভাবে ব্যবহারের লক্ষ্যে চলমান অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

গত বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সড়ক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজধানীর যানজট নিরসন কীভাবে হবে, তা বৈঠকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাজধানীর ইনার সার্কুলার রিং রোড নির্মাণ প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা অবহিত করা হয়েছে। 

বৈঠকে জানানো হয়, রাজধানীর ইনার সার্কুলার রিং রোড প্রকল্পটি গাবতলী থেকে বাবুবাজার এবং পোস্তগোলা থেকে ডেমরা পর্যন্ত বিস্তৃত। ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পের রায়েরবাজার, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচর অংশের নির্মাণকাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত প্রকল্পটির ৪৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। 

বৃত্তাকার এ সড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হলে ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-মাওয়া ও ঢাকা-চট্টগ্রাম গামী যানবাহনকে রাজধানীর অভ্যন্তরীণ সড়ক ব্যবহার করতে হবে না। ফলে রাজধানীর সড়কে যানবাহনের চাপ কমবে এবং যানজটও হ্রাস পাবে।



  বিষয়:   ঢাকা  যানজট  সরকার  বৃত্তাকার নৌপথ  বৃত্তাকার সড়কপথ 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: