স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) প্রণয়ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পৃথক রোডম্যাপ করা হয়েছে। চলতি মাসের শেষের দিকে এগুলো চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা হতে পারে। আগস্টের দ্বিতীয়ার্ধে তপশিল ঘোষণা করে অক্টোবরের প্রথমার্ধে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ নাকি ইউনিয়ন পরিষদ-কোন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আগে হবে তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আগে অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপে বসার পরিকল্পনা করছে কমিশন।
কমিশনের ভাবনায় রয়েছে- রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, নির্বাচন বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে জনগণের জন্য কোন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আগে আয়োজন করা বেশি জরুরি ও উপযোগী হবে, সে বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। এ ক্ষেত্রে চলতি মাসে সংলাপ শুরু করে আগস্টে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংলাপ শেষেই হবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা। ইসি সচিবালয় সংলাপের তারিখ নির্ধারণের জন্য চলতি সপ্তাহে ফাইল উপস্থাপন করবে। ইসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পেলে সংলাপের আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হবে সংশ্লিষ্টদের।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, এবার সারাদেশে ইউপি, পৌরসভা, উপজেলা নির্বাচন অঞ্চলভেদে কয়েক ধাপে হতে পারে। প্রতিটি ধাপের মধ্যে সময়ের ব্যবধান বাড়তে পারে। ধাপ নির্ধারণে যাতায়াত ব্যবস্থা, একাডেমিক ক্যালেন্ডার, আবহাওয়া পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। ইসির নির্বাচন শাখার উপ-সচিব মো. মনির হোসেন গতকাল রোববার এ সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচন কমিশনের একজন সদস্য জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে আচরণবিধি সংশোধনের কাজ চলছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নির্বাচন আয়োজনের সময়সূচি ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে। তিনি আরও বলেন, কোন স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আগে হবে, সে বিষয়ে এখনো কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে প্রয়োজন হলে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত গ্রহণের জন্য সংলাপ আয়োজন করা হবে।
সব রাজনৈতিক দলকে সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হবে কি না- এ প্রশ্নের জবাবে ওই কমিশনার বলেন, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে কমিশন প্রয়োজন মনে করলে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবে। কারণ একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে অংশীজনদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসি সচিবালয়ের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, অতীতে ধাপ ভিত্তিক এক নির্বাচন হতে অন্য নির্বাচন পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান কম ছিল। এজন্য মাঠ পর্যায়ে মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই, আপিল নিষ্পত্তি, প্রতীক বরাদ্দ, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও ব্যালট পেপার পরিবহনসহ ইত্যাদি কার্যক্রম সম্পাদন করতে এক ধাপ হতে অন্য ধাপের সময়ের ব্যবধান কম থাকার কারণে কার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
এক ধাপ হতে অন্য ধাপের নির্বাচনের সময়ের ব্যবধান কম থাকায় ভোটকেন্দ্রসহ আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এক এলাকা হতে অন্য এলাকায় পৌঁছে দায়িত্ব পালনে অসুবিধার সৃষ্টি হয়। এই বিষয়গুলো সামনে রেখেই ধাপগুলোর মাঝে সময় ব্যবধান নির্ধারণ করা হবে। ইতোমধ্যে এসব প্রস্তাবনা নিয়ে বৈঠকও করেছে কমিশন। এতে ইউপি নির্বাচন আগে করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে ১ অক্টোবর নির্বাচন শুরু হওয়ার দিন ধরে তারা ৪০ থেকে ৪৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এদিকে আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে যাদের বয়স ১৮ বছর হবে, তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ ভোটারের জন্য একটি ভোটকক্ষ রাখার কথাও ভাবা হচ্ছে। অন্যদিকে বেসরকারি কলেজের শিক্ষকরা ভোটে অংশ নিতে পারবেন না কিনা, তাও নিয়ে আইন সংশোধনের কথা এসেছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন পরিচালনা শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যুগ্ম-সচিব (নির্বাচন ব্যবস্থাপনা-১) রাশেদুল ইসলাম বলেন, আমরা বৈঠক করে প্রস্তুতির সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। অক্টোবরে নির্বাচন শুরুর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ইউপি দিয়ে ভোট শুরু হতে পারে। এছাড়া কিছু বিধিমালা সংশোধন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে সবকিছু চূড়ান্ত হবে কমিশন বৈঠকে।
জানা গেছে, দেশের বেশির ভাগ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রায় দুই বছর ধরে জনপ্রতিনিধিশূন্য রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা চলছে। নির্দলীয় স্থানীয় নির্বাচনে ইতোমধ্যে অনেক দল তাদের প্রার্থীর নামও ঘোষণা করেছে। তথ্যমতে, সারাদেশে মোট ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ আছে। এর মধ্যে চলতি বছরে নির্বাচন উপযোগী হয়েছে ৩ হাজার ৯৮১টি ইউপি। বাকিগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালে ভোট উপযোগী হবে। এছাড়া দেশের ৩৩০টি পৌরসভার মধ্যে ৩২০টি নির্বাচন উপযোগী হয়েছে। আইনি জটিলতায় ১০টি পৌরসভা নির্বাচন উপযোগী নয়।
এদিকে নতুন ৫টিসহ দেশে মোট উপজেলা ৫০০টি। সবগুলোই নির্বাচন উপযোগী। নতুন করে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা ভাগ করে মোকামতলা, কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা ভাগ করে মাতামুহুরী, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা ভাগ করে রুহিয়া ও ভুল্লী এবং লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা ভাগ করে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা গঠন করা হয়েছে।
অন্যদিকে নতুন করে সৃষ্টি হওয়া বগুড়া সিটি করপোরেশনসহ দেশের মোট ১৩টি সিটি রয়েছে। বর্তমানে সবগুলোই নির্বাচন উপযোগী। ইউপি বাদে অধিকাংশ স্থানীয় সরকার চলছে প্রশাসক দিয়ে।
ইসি সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন পর স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এবারের নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাধারণত জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন ঘটায়। সেই লক্ষ্যে দেশ জুড়ে নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। পোস্টার-ব্যানারের মাধ্যমে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন।
আগামী অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হতে পারে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। জাতীয় সংসদের মতো স্থানীয় সরকারের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে না। ফলে আওয়ামী লীগ ছাড়াই জোর নির্বাচনি তৎপরতা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রথম ধাপ হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোরদার প্রস্তুতি শুরু করেছে ইসি। এ লক্ষ্যে বিধিমালা সংশোধনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
সংশোধিত বিধিমালায় অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ, পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ, প্রবাসীর জন্য পোস্টাল ব্যালট বাতিলসহ নির্বাচনি প্রচারে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া বেশিসংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়ন ঠেকাতে জামানতের পরিমাণ বাড়ানোসহ বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে বিধিমালায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার এবং ইসির আইন-বিধিমালা সংস্কার কমিটির প্রধান আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আপাতত সংসদে পাশ হওয়া আইনের আলোকে স্থানীয় সরকার বিধিমালার কোন কোন জায়গায় সংশোধন করা যেতে পারে। সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। আইন-কানুন চূড়ান্ত হওয়ার পরই ভোটের তপশিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সরকার সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের কথা বলেছে। আমরাও সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি।