ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের যন্ত্রণা, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

এসএম শামসুজ্জোহা

জাতীয়

বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় আগের মতোই থাকলেও অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, এখন আগের তুলনায় দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি টাকা কেটে নেয়া হচ্ছে। এতে বড়

2026-07-05T12:40:38+00:00
2026-07-05T12:40:38+00:00
  বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬,
১১ ভাদ্র ১৪৩৩
 
বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
জবাবদিহি না থাকায় দিশেহারা গ্রাহক
ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের যন্ত্রণা, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা
এসএম শামসুজ্জোহা
রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪০ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় আগের মতোই থাকলেও অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, এখন আগের তুলনায় দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি টাকা কেটে নেয়া হচ্ছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। 

বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে শুধু কারিগরি ত্রুটি নয়, বরং বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে দেখছেন। এমনিতেই সারা দেশে লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। তীব্র গরমে ঘরে টেকা দায়। তার ওপর যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল। ব্যবহারের চেয়ে অনেক বেশি বিলের চাপ। 

প্রতিবছর মে-জুন মাস এলেই এই যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় সাধারণ মানুষকে, যা নিয়ে হইচই হয় কিছুদিন। তারপর সব শান্ত। মাঝখান থেকে গ্রাহকের পকেট কাটে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো। 

তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, আমরা এরই মধ্যে সব ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানকে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছি। কোনো গ্রাহক যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং অভিযোগগুলো যথাযথভাবে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়া হয়েছে। 

যেসব গ্রাহক এমন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তাদের সরাসরি বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে অথবা হটলাইনে যোগাযোগ করে অভিযোগ জানানোর অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) বিদ্যুৎ অপচয় ও চুরির মাধ্যমে তৈরি হওয়া মাত্রাতিরিক্ত সিস্টেম লস কমাতে গ্রাহকের কাঁধে বাড়তি বিলের বোঝা চাপানো হয়। আবার প্রতিবছর জুন ক্লোজিংয়ে বকেয়া মাস কমিয়ে আয় বাড়ানো এবং মিটার রিডারদের গাফিলতি গ্রাহকদের উস্কে দেয় ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের যন্ত্রণা। 

তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ৬ টি বিতরণ কোম্পানির প্রায় ৫ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে আরইবির গ্রাহক প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ৫৮ হাজার। মোট গ্রাহকের ৫৫ লাখ প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারী। যাদের ক্ষেত্রে মিটারে ত্রুটি ছাড়া ভুতুড়ে বিলের সুযোগ নেই। 

বাকি যে বিপুলসংখ্যক পোস্টপেইড গ্রাহক রয়েছেন, সেখানেই মূলত ভুতুড়ে বিলের কারসাজি হয়। বেশিরভাগ পোস্টপেইড গ্রাহকই আরইবির। সংস্থাটি দেশ জুড়ে ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা জানান, প্রতি বছর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোকে সিস্টেম লস কমানোর টার্গেট দেয় আরইবি। সেই টার্গেট পূরণ না হলে জুন ক্লোজিংয়ের আগে বাড়তি বিল করারও মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে। যদিও লিখিত নির্দেশনা না থাকায় এর প্রমাণ জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। 

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এই সিস্টেম লস কমানোর তখন একমাত্র উপায় থাকে গ্রাহকের কাঁধে বাড়তি বিলের বোঝা চাপানো। অনেকে আবার আরইবির সুনজরে থাকতে পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধির জন্যও বেছে নেন এই কৌশল। আরেক কর্মকর্তা বলেন, যেসব কর্মকর্তারা একটু চতুর। তারা জুনের দুই-তিন মাস আগে থেকেই অল্প অল্প করে বাড়তি বিল তৈরি করেন, যাতে গ্রাহক বুঝতে না পারেন। 

এ প্রসঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, আরইবিসহ অন্যান্য বিতরণ সংস্থাগুলোতে সিস্টেম লস কমানোর এই অপকৌশল সম্পর্কে অনেকেই জানেন। কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নেয় না। কারণ বিদ্যুৎ খাতে সেবা দেওয়ার পরিবর্তে লুণ্ঠন হচ্ছে। পুরো সিস্টেম অসততার মনোবৃত্তির কাঠামোর মধ্যে ঢুকে পড়েছে। ফলে মানুষ জ্বালানিতে সুবিচার পাচ্ছে না। 

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন দরকার। সেই পরিবর্তন হবে জনগণ শক্তিশালী হলে। কিন্তু মানুষের প্রতিবাদ ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সবাই সবকিছু মেনে নিচ্ছে। এটাই আসলে বড় সংকট- যোগ করেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সিজা রহমান গত পাঁচ বছর ধরে একই বাসায় থাকছেন। সাধারণত তার মাসিক বিদ্যুৎ খরচ দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু জুন মাসে এসে সেই খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। 

তিনি বলেন, ‘এটা পুরোপুরি একটা ভুতুড়ে ব্যাপার মনে হচ্ছে। এমনটা আগে কখনো হয়নি। স্বাভাবিকের তুলনায় তিন-চার গুণ বেশি। আমরা এরই মধ্যে রিচার্জ করেছি। মাত্র ১৫ দিনেই ৬ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়ে গেছে। 

এর আগে যা রিচার্জ করেছি, সব মিলিয়ে এক মাসে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।’ সাবেক সরকারি কর্মকর্তা লতিফ বকশীর অভিজ্ঞতা আরও তিক্ত। প্রি-পেইড মিটারে ৮ হাজার টাকা রিচার্জ করার মাত্র তিন দিনের মধ্যেই ৭ হাজার টাকার বেশি কেটে নেয়া হয়েছে। 

তিনি বলেন, ‘গত ২৮ জুন আমি ৮ হাজার টাকা রিচার্জ করেছিলাম। ২৮, ২৯ ও ৩০ জুন শেষে আমার ব্যালেন্স ছিল মাত্র ৯৬১ টাকা। এটা কীভাবে সম্ভব। সাধারণত মাসে আমার ৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। কিন্তু এ মাসে যেভাবে টাকা কাটা হয়েছে, সেটা অবিশ্বাস্য। অভিযোগ করলে বলে, তাদের কিছু করার নেই।’

রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন অভিযোগ করছেন অসংখ্য গ্রাহক। জুন মাস থেকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে ঠিকই। কিন্তু যে হারে টাকা কাটা হচ্ছে তা অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় একই থাকলেও অনেককে আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি বিল দিতে হচ্ছে। 

গ্রাহকদের অভিযোগ, আগে কখনো এভাবে টাকা কাটা হয়নি। টাকা রিচার্জ করার পর দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ এর কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে না। তাদের প্রশ্ন, বিদ্যুতের দাম বাড়লেও কি একটি সাধারণ পরিবারের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চার্জ হওয়া স্বাভাবিক? 

অনেকে বলছেন, আগে এক হাজার টাকা এক মাসেরও বেশি সময় চলত। এখন এক মাস তো দূরের কথা, অনেক দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। অস্বাভাবিক হারে বিদ্যুৎ বিল বাড়ানো বিতরণ সংস্থাগুলোর এক ধরনের আর্থিক অনিয়মের কৌশল। গ্রাহকদের প্রতি এসব প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেক গ্রাহক। 

অতিরিক্ত বিল আদায়সহ বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ নিয়মিত সামনে আসায় বিশেষজ্ঞরা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে আরও বেশি জবাবদিহির আওতায় আনার পরামর্শ দিচ্ছেন। 

এ ব্যাপারে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি ডি রহমতউল্লাহ বলেন, বিদ্যুতের সিস্টেম লস কমানো এবং আয় বাড়ানোর জন্য ওপর থেকে চাপ দেওয়ার কারণেই নিচের দিকের কর্মীরা তা বাধ্য হয়ে করেন। আবার তারাই গ্রাহকের রোষের মুখে পড়ছে। কিন্তু যারা এই চাপ দিচ্ছে তাদের কিছুই হচ্ছে না। 

তিনি আরও বলেন, আগে অনিয়ম যেভাবে ম্যানুয়ালি হতো, এখন তা ডিজিটাল পদ্ধতিতে হচ্ছে। এখানে কেউ জবাবদিহির মধ্যে নেই। যদি ডিজিটাল মিটারে ভুল প্রোগ্রামিং থাকে বা ওভার রিডিংয়ের ঘটনা ঘটে, তাহলে এর জন্য কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কোনো কর্মকর্তার চাকরি যায়নি, কোনো লাইনম্যানকে জবাবদিহি করতে হয়নি। তাহলে দায় নেবে কে?


  বিষয়:   গ্রাহক  বিদ্যুৎ  বিদ্যুৎ বিল  লোডশেডিং 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: