দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে সংঘর্ষ, সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের পাশাপাশি এখন একই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও সংঘাত বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার, কমিটি গঠন, রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা, বাজার ও স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সংঘর্ষের খবর মিলছে।
রাজধানী থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। এসব সংঘর্ষে প্রাণহানির পাশাপাশি আহত হচ্ছেন শত শত মানুষ। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষও এই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই দেশে প্রায় সাড়ে তিনশ রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে অর্ধশতাধিক মানুষ নিহত এবং আড়াই হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের মধ্যে সংখ্যাগত কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে সবাই একমত, রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রা বাড়ছে এবং এর বড় অংশই দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কেন্দ্র করে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন অনেক ক্ষেত্রে আদর্শের চেয়ে প্রভাব ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে বাজার, পরিবহন, ঠিকাদারি, বালুমহাল, সরকারি প্রকল্প এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সংঘর্ষকে উসকে দিচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া কয়েকটি আলোচিত হত্যাকান্ড পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করেছে। গাইবান্ধা, রাজবাড়ী, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধের জেরে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনায় রাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষ থাকলেও একই দলের ভেতরের কোন্দল এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, কমিটি নিয়ে বিরোধ, স্থানীয় প্রভাব বিস্তার এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা থেকে এসব সংঘর্ষের সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক বিভক্তি অনেক সময় রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। গবেষকদের মতে, অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তি না হওয়াও সহিংসতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আইনের কঠোর প্রয়োগ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা কমছে না।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের ভাষ্য, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতার ঘাটতি, জবাবদিহির অভাব এবং দলীয় শৃঙ্খলার দুর্বলতা বর্তমান সংকটকে আরও গভীর করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধে জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর বিভিন্ন সময়ের তথ্যেও রাজনৈতিক সহিংসতার ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতির চিত্র উঠে এসেছে। এসব সংস্থার পর্যবেক্ষণে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, দখল, রাজনৈতিক প্রতিশোধ এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধকে সহিংসতার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে ৬ হাজার ৫৮০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১ হাজার ৫৯১ জন নিহত এবং ৬৬ হাজার ১১৪ জন আহত হয়েছেন। চলতি বছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসেও ধারাবাহিকভাবে সহিংসতা বেড়েছে। অধিকাংশ ঘটনার নেপথ্যে ছিল আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক সহিংসতা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি গণতান্ত্রিক চর্চা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সংঘর্ষের কারণে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হয়, মানুষের নিরাপত্তাবোধ কমে যায় এবং বিনিয়োগ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) ভোরের ডাককে বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং অপরাধ দমনে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শুধু মামলা দায়ের করলেই হবে না; দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ গবেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক পদ-পদবি এখন অনেকের কাছে সামাজিক মর্যাদার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফলে ক্ষমতার কেন্দ্র দখলে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। অপরাধ করেও অনেক ক্ষেত্রে শাস্তি না পাওয়ার সংস্কৃতি সহিংসতাকে আরও উৎসাহিত করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া।
পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতা কমাতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, দলীয় শৃঙ্খলা জোরদার করে অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব যেন কাজ না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে সংলাপ, সহাবস্থান এবং মতপার্থক্য শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
তাদের মতে, গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল শক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং সহনশীলতা। সেই সংস্কৃতি দুর্বল হলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সহজেই সহিংসতায় রূপ নেয়। তাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং জবাবদিহিমূলক সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারলেই সহিংসতার বর্তমান প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রতিটি সহিংস ঘটনা শুধু একটি প্রাণহানির পরিসংখ্যান নয়; বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং জনগণের নিরাপত্তাবোধের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। সেই কারণে রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজ, সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগেই শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।