কিশোরগঞ্জের ভৈরবে তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে এবং স্বাস্থ্যসেবাও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে হাসপাতালে রোগীদের অস্ত্রোপচার পরিচালনায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরমে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপও বেড়েছে।
ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহকদের দাবি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে জনদুর্ভোগ থেকে তাদের মুক্তি দিতে হবে।
ভৈরব দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে ছোট-বড় শিল্প-কারখানাসহ প্রায় ৪ হাজার মিল-কারখানা এবং কয়েক হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহের কারণে এসি, ফ্রিজ, টেলিভিশন, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফ্রিজে সংরক্ষিত মাছ, মাংস ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রচণ্ড গরমের পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের কারণে এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীর লেখাপড়ায়ও বিঘ্ন ঘটছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
এদিকে অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, নিয়মিত লোডশেডিং হলেও মিটারের রিডিংয়ের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিলের কোনো সামঞ্জস্য নেই। তাদের অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।
ভৈরব বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় আবাসিক গ্রাহক প্রায় ৪৮ হাজার, বাণিজ্যিক গ্রাহক ৫ হাজার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ৭০০টির বেশি এবং প্রায় ৪০০টি অটোরিকশা গ্যারেজ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎনির্ভর হওয়ায় লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে ভৈরবে বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ৩৫ মেগাওয়াট।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাবেক কাউন্সিলর রাজিব সওদাগর জানান, প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং হওয়ায় তার বরফ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। পাশাপাশি প্রচণ্ড গরমে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
আইস ফ্যাক্টরির একাধিক মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে এবং ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্যসামগ্রীও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. আ. করিম বলেন, প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। এর ফলে রোগীদের নির্ধারিত সময়ে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া প্রচণ্ড গরমে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে সব বয়সী মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন।
এ বিষয়ে ভৈরব বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান মাহমুদ এলাহী জানান, ভৈরব পাওয়ার লিমিটেডের (বিপিএল) তিনটি ইউনিট বন্ধ থাকায় তারা প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে ভৈরব পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপক নাজমুল হক জানান, বিপিএল সচল রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৯০ টন জ্বালানি প্রয়োজন হলেও তারা মাত্র ১৫ থেকে ২০ টন জ্বালানি পাচ্ছেন। চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় তিনটি ইউনিট চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে ভৈরবের সার্বিক বিদ্যুৎ সরবরাহে।