সকালের ঘণ্টা বাজতেই একে একে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। বই-খাতা গুছিয়ে বেঞ্চে বসলেও পাঠে মনোযোগ দেওয়ার আগেই তাদের দৃষ্টি চলে যায় মাথার ওপরের জীর্ণ টিনের ছাদ ও দেয়ালজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বড় বড় ফাটলের দিকে। প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো ভবনে প্রতিদিনই চলছে পাঠদান, আর নীরব আতঙ্কে দিন কাটছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৩৫ সালে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুশা ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী রহিমাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। একসময় এটি এলাকার শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিদ্যালয়টির ভবন বর্তমানে অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
বিদ্যালয় ভবনের দেয়ালজুড়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ক্ষতিগ্রস্ত টিনের ছাদ দিয়ে বর্ষাকালে নিয়মিত পানি চুঁইয়ে পড়ে। এতে শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক সময় কক্ষগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শ্যামলী রানী জানান, বর্তমানে শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১৯৩ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করছে।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের ভবন দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বিষয়টি একাধিকবার উপজেলা শিক্ষা অফিসকে জানানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সংস্কার কাজ শুরু হয়নি। প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যেই পাঠদান পরিচালনা করতে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, শ্রেণিকক্ষের সংকটের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। আগে এক শিফটে ক্লাস হলেও গত এক বছর ধরে বাধ্য হয়ে দুই শিফটে পাঠদান চালাতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা জানায়, বর্ষাকালে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়। অনেক সময় ভেজা মেঝেতে বসেই ক্লাস করতে হয়। এতে পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে এবং নিয়মিত পাঠ গ্রহণ ব্যাহত হচ্ছে।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রাব্বি, মোহাম্মদ জাকারিয়া ও প্রতিমা জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে প্রতিদিন ক্লাস করতে তাদের ভয় লাগে।
অভিভাবক নারায়ণ রায় বলেন, ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি এলাকার একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু বর্তমানে এর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ভবনটি দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। প্রতিদিন সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে। অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়ে অন্য বিদ্যালয়ে সন্তানদের ভর্তি করাচ্ছেন। ফলে এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।
আরেক অভিভাবক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, এটি এলাকার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমিও এই বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ে কোনো সীমানা প্রাচীর নেই। ফলে জমি ধীরে ধীরে বেদখলের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাগমা শিলভিয়া খান বলেন, বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।