তৈরি পোশাক খাতের বাইরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের নতুন দ্বার উন্মোচন করছে লেদার ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প। দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাবনার দুই খাতেই রপ্তানি আয় ও বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লেদার খাতের রপ্তানি আয় ১.১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের রপ্তানি আয় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতি সহায়তা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে আগামী দশকে এই দুই খাত দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হতে পারে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-পরবর্তী সময়ে লেদার ও লেদারজাত পণ্যের রপ্তানি আয় ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১.০৩ বিলিয়ন ডলার, ২১-২২ অর্থবছরে ১.২৪ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১.১৭ বিলিয়ন ডলার,২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১.০৩ বিলিয়ন ডলার,২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১.১৪ বিলিয়ন ডলার, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খাতটির রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ১০.১৯ শতাংশ বেড়েছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ২.৩৬ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে। লেদার ও লেদারজাত পণ্যের রপ্তানি আয় গত পাঁচ বছরে ওঠানামা করলেও খাতটি এক বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আমাদের রপ্তানিমুখী বেশ কয়েকটি খাতের মধ্যে রেডিমেট গার্মেন্টসের পরেই লেদার এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় খাত। দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধির জন্য সরকার কাজ করছে। এ জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, নীতিগত সহায়তা, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকার কাজ করছে।
তিনি আরো বলেন, তৈরি পোশাকের ওপর রপ্তানি নির্ভরতা কমাতে জাতীয় বাজেটে লেদার (চামড়া) ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতকে উচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে বাজেটে শুল্ক ছাড়, কর অবকাশ এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৩৪টিরও বেশি দেশে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করছে। দেশের চামড়া শিল্প বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারের প্রায় ৩ শতাংশ অংশীদারিত্ব ধরে রেখেছে। উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ রপ্তানি করে। সরকার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এ খাত থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
অপরদিকে, বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ খাতে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে ৮.২ বিলিয়ন ডলারের বেশি। রপ্তানি সক্ষমতা প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাত থেকে ১২.৫৬ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ বর্তমানে অপরদিকে, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংকে দেশের শিল্পায়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কৃষি যন্ত্রপাতি, অটো পার্টস, বাইসাইকেল, শিল্প যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও প্রকৌশল পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে এ খাত দেশের শিল্পখাতকে সহায়তা করছে।
বিআইডিএসসহ বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্প সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৮০ হাজারের বেশি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট রয়েছে। খাতটিতে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ২৪-২৫ অর্থবছরে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের রপ্তানি ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।
তবে শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রকৃত সক্ষমতার তুলনায় এটি এখনও অনেক কম। গুরুত্বপূর্ণ এই দুই খাত প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনও তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো ধাক্কা এলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে চাপ সৃষ্টি হয়।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য লেদার ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতকে দ্রুত শক্তিশালী করা প্রয়োজন। লেদার খাতের বড় সুবিধা হলো দেশীয় কাঁচামাল। প্রতিবছর কোরবানির পশুর চামড়াসহ বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল দেশে উৎপাদিত হয়। অন্যদিকে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত স্থানীয় শিল্পের জন্য যন্ত্রাংশ তৈরি করে আমদানি নির্ভরতা কমাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে শ্রম ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ায় দুই খাতেই প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা রয়েছে। তবে প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত না করলে বৈশ্বিক বাজারে বড় অবস্থান তৈরি করা কঠিন হবে।
ট্যানারি শিল্পে পরিবেশগত মান নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ অর্জনে সহায়তা, গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ, দক্ষ প্রকৌশলী ও কারিগরি জনবল তৈরি, নতুন বাজার অনুসন্ধান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, চামড়া শিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কাঁচামাল সংগ্রহ, মূল্য শৃঙ্খল উন্নয়ন, পরিবেশগত মান রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা পূরণে এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে।
গবেষকরা মনে করেন, সাভার ট্যানারি শিল্পনগরের পরিবেশগত সমস্যা সমাধান করা গেলে খাতটি দ্রুত এগিয়ে যাবে।
অন্যদিকে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, এ খাতে রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মান নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তি এবং বাজার তথ্যের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেছেন, তৈরি পোশাক খাতের মতো নীতি সহায়তা পেলে লেদার খাতের রপ্তানি ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে এটি ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে।
ব্যবসায়ীদের মতে, সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সনদ না পাওয়ায় অনেক বড় ক্রেতা এখনও বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহে আগ্রহী হচ্ছে না।
বাংলাদেশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিইআইওএ)-এর শীর্ষ নেতা মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, বিশ্বে প্রকৌশল পণ্যের বাজার প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের। সেখানে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব এখনও ১ শতাংশেরও কম। প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রকৌশল পণ্যের বাজার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার। দেশীয় শিল্প ইতোমধ্যে স্থানীয় চাহিদার বড় অংশ পূরণ করছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (আরএপিআইডি) -এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ২ শতাংশেরও কম লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান সরাসরি রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত।
তবে আরও ১৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান রপ্তানিতে আগ্রহী এবং সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। রপ্তানিযোগ্য মান, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বিপণন সক্ষমতা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি আধুনিকায়ন করা গেলে এ খাত দ্রুত বৈদেশিক বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে লেদার খাতের রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। একই সময়ে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাত থেকে ১২.৫৬ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সম্ভাবনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার সাভার ট্যানারি শিল্পনগরের পরিবেশগত মান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও অটোমেশন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণসহ এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।