জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া এক সাক্ষীর জবানবন্দিতে উঠে এসেছে ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতার বর্ণনা। তিনি জানিয়েছেন, গুলিবিদ্ধ এক আন্দোলনকারীকে হাসপাতালে নেওয়ার পর ফেরার পথে রিকশা থামিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে বলতে শুনেছিলেন, ‘স্যার, এদের গুলি করে দিই।’ এ কথা শুনে রিকশায় থাকা সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মামলার সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারিত ছিল। মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম এবং রাশেদ খান মেনন আসামি হিসেবে রয়েছেন।
নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম-পরিচয় গোপন রাখা এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ট্রাইব্যুনালে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার সাক্ষ্য রেকর্ড করা হয়।
জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। ১৮ জুলাই রাজধানীর বাড্ডা পোস্ট অফিস রোড ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনের সময় পুলিশ টিয়ারশেল ও ছররা গুলি ছোড়ে বলে তিনি দাবি করেন। ওই দিন বহু আন্দোলনকারী আহত হন এবং একজন শিক্ষার্থী নিহত হন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর তিনি, মারুফ, ফয়সাল ও রাজিব মিলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মিছিলে অংশ নেন। পরে রামপুরা ব্রিজের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে কয়েকজনকে নিহত হতে দেখেন বলে দাবি করেন।
তিনি বলেন, মাগরিবের আগে হঠাৎ গুলির শব্দ শোনার পর মারুফকে ফুটপাতে পড়ে থাকতে দেখেন। কাছে গিয়ে বুঝতে পারেন, তার তলপেটে গুলি লেগেছে। মারুফ তখন তাকে বলেন, ‘মামা, আমার গুলি লেগেছে, আমাকে বাঁচাও।’ পরে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
সাক্ষী আরও জানান, গুরুতর আহত মারুফকে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু পথে রামপুরা এলাকায় পুলিশ ও বিজিবির বাধার কারণে অ্যাম্বুলেন্স প্রায় আধা ঘণ্টা আটকে থাকে। এতে মারুফের অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।
তার দাবি, শান্তিনগর এলাকায় পৌঁছানোর আগেই মারুফ মারা যান। এরপরও তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
জবানবন্দিতে ওই শিক্ষার্থী বলেন, রাতের দিকে হাসপাতাল থেকে ফেরার সময় রমনা থানার সামনে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা তাদের রিকশা থামান। এ সময় এক পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনেন, ‘স্যার, এদের গুলি করে দিই।’ পরে অন্য এক সদস্য তাদের ছেড়ে দেওয়ার কথা বললে তারা সেখান থেকে চলে যেতে সক্ষম হন।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মামলার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এ সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, মঈনুল করিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সুলতান মাহমুদসহ অন্যান্য আইনজীবীরা।