একসময় রাজধানীতে জালের মতো ছড়িয়ে ছিল আঁকাবাঁকা খাল, বিল ও ঝিল। ফলে বৃষ্টি হলে পানি খাল, বিল ও ঝিল হয়ে নদীতে চলে যেতো সহজেই। এতে দ্রুত পরিষ্কার হতো ঢাকা শহর। এই খালগুলো সংরক্ষণ করে ঢাকা শহর সম্প্রসারণ করলে পৃথিবীর অন্যতম দৃষ্টিনন্দনীয় রাজধানী হতো ঢাকা।
তবে যে কয়টি খাল রয়েছে তা দখল ও দূষণমুক্ত করতে কাজ করছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২৭টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ২৯টি ছোট বড় খাল দূষণ-দখলমুক্ত ও ময়লা আবর্জনা অপসারণের কাজ চলছে।
এ কাজ শেষ হলে বিমারকেশনের মাধ্যমে খালের দুই পাশে গাইড ওয়াল নির্মাণ করে খালগুলোকে স্থায়ী সংরক্ষণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে দুই সিটি। এটি বাস্তবায়ন হলে কেউ চাইলেও খাল আগের মতো দখল ও দূষণ করতে পারবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় দুই সিটি এলাকায় ৫৬টি খাল সচল ছিল। এসব খাল দখল হতে হতে এখন ২৬টি সচল রয়েছে। তাও ময়লা আবর্জনায় দূষণে পানির প্রবাহ অনেক কম। ফলে প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতায় পদে পদে বিড়ম্বনা পোহচ্ছে নগরবাসী।
২০২০ সালের ২১ ডিসেম্বর ২৬টি খাল ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে বুঝে নিয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। তবে দায়িত্ব নিয়ে দুই সিটির জোরদার অভিযানে অনেকটাই বদলেছে খালের চিত্র। এতে দখলদারদের অনেকটাই রোধ করা গেলেও খালে ময়লা আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে পারেনি দুই সিটি। ফলে এ সমস্যা নিরসনে খাল নিয়ে ইতিমধ্যে মাস্টার প্লান তৈরি করছে দুই সিটি।
এর মধ্যে উত্তর সিটির আওতাধীন খালগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত করে নৌপথ চালু, নান্দনিকভাবে সাজানোসহ মহা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
এছাড়া, খাল দূষণমুক্ত করে খালের সীমানা নির্ধারণ, খাল পাড়ের খাস জমি খালের সীমানায় অন্তর্ভুক্ত করা, খালের পাড় বাঁধাই, খালপাড়ে ওয়াকওয়ে, সাইকেল লেন এবং গাছ লাগানোসহ নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
জানা গেছে, উত্তর সিটি এলাকার ১৩টি খাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছিল ঢাকা ওয়াসা। যদিও প্রতিষ্ঠানটির অধীনে কাগজ-কলমে ২৯টি খাল এবং একটি রেগুলেটিং পন্ড রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি খাল বেদখলে। সেখানে গড়ে উঠেছে হাজারো বহুতল ভবন, মার্কেট ও নানা স্থাপনা।
সিএস ম্যাপ অনুযায়ী, একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এসব খালের সীমানা নির্ধারণ ও দখল-দূষণ মুক্তের কাজ করছে উত্তর সিটি।
ইতিমধ্যে রাজধানীর মিরপুরের বাইশটেকি ও জয়নগর, প্যারিস খালসহ আরো কয়েটি খাল দখলমুক্ত ও পরিষ্কার করা হয়েছে। সেগুলোতে পানিপ্রবাহ তৈরির কাজ চলছে।
উত্তর সিটি বলছে, বিগত সরকার আন্তরিকতার সাথে খাল দখলমুক্ত ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। বর্তমান সরকার নগরবাসী স্বার্থে প্রতিটি অলিগলিতে ও খালে ময়লা আবর্জনা অপসারণ কাজ শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানিয়েছে, উন্নত দেশগুলোতে বাড়ির সামনে খাল বা লেক রয়েছে। আমাদের এখানে খালকে বাড়ির পেছনে ফেলা হয় পরবর্তীতে সেই খাল ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এজন্য একের পর এক খাল দখল হয়ে গেছে। কিন্তু এভাবে চলতে দেওয়া যায় না।
উত্তর সিটির মহাপরিকল্পনা রয়েছে, সূতিভোলা খাল দিয়ে নৌকা নিয়ে সাঁতারকুল হয়ে আফতাবনগর দিয়ে হাতিরঝিল ঘুরে বালু নদীতে নৌকা চলাচল করা। নতুন একটি নৌপথ চালু করার পরিকল্পনাও রয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য খালগুলো দখল ও দুষণমুক্ত করে একই উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ঢাকার জলাবদ্ধতা ও যানজট অনেকটাই কমবে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে, ঢাকার খালগুলো দখলমুক্তের পর স্থায়ী সংরক্ষণ করা হবে বলে জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার ,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, ঢাকা শহরের খাল গুলো সংরক্ষণ করা না হলে ঢাকা নগরী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। তাই নগরবাসীর স্বার্থেই খালগুলো পুনরুদ্ধার করে স্থায়ী সংরক্ষণে নগরবাসীকে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
শনিবার মিরপুর-১২ মুসলিম বাজার খালের ময়লা অপসারণ কার্যক্রম পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন। এ সময় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২৭টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ২৯টি ছোট বড় খাল দখলমুক্ত ও ময়লা আবর্জনা অপসারণের কাজ চলছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, শুধু মুসলিম বাজার খাল থেকে প্রায় ৪৫০ ট্রাক ময়লা অপসারণ করা হয়েছে। এভাবে সকল খালের ময়লা অপসারণ করা হবে। খালের ময়লা অপসারণের মাধ্যমে নগরবাসীকে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার হাত হতে রক্ষা করা হবে।
তিনি বলেন, খাল গুলো দখলমুক্ত করে ময়লা আবর্জনা মুক্ত করা না গেলে ঢাকা নগরী বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, যতদিন সিটি কর্পোরেশন থাকবে, যতদিন প্রশাসক থাকবেন, ততদিন ঢাকা শহরের ময়লা আবর্জনা অপসারণ, খাল-বিল পুনরুদ্ধার, বিমারকেশন লাইনিং ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলমান থাকবে ।
এসময় ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী ও প্রয়োজন অনুযায়ী সকল সেবামূলক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চলমান থাকবে এবং অব্যাহতভাবে কাজ করা হবে।
প্রশাসক আরো জানান, গত ০৫ জুন তারিখের পর হতে এ পর্যন্ত মুসলিম বাজার খাল থেকে ৪১৬ ট্রাক মাটির তলদেশের শ্লাস ময়লা অপসারণ করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ ১৯ বছর ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে এভাবে কোন খাল হতে ময়লা আবর্জনা অপসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
প্রশাসন জানান, মুসলিম বাজার খাল ময়লা আবর্জনায় ভরা ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার আলোকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন সকল খাল এভাবে পরিষ্কার করা হবে এবং নগরবাসীকে জলাবদ্ধতা মুক্ত নগর উপহার দেওয়া হবে। নগরবাসীকে ডেঙ্গু মুক্ত শহর উপহার লক্ষ্যে নগরীর প্রতিটি অলিগলি ও খালসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা কাজ করে যাচ্ছে জানিয়ে প্রশাসক আরো জানান, এই কাজ চলমান থাকবে এবং অব্যাহত থাকবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রশাসক জানান, নগরবাসী স্বার্থে একই রাস্তা বারবার খনন না করে ওয়াসা ও ডেসকোর সাথে সমন্বিত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করা হবে। মুসলিম বাজার খাল পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম উদ্বোধন শেষে প্রতিমন্ত্রী ও ডিএনসিসির প্রশাসক খালের আশেপাশে সরজমিনে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিদর্শন করেন।