সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকার বহু এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পলিথিন-প্লাস্টিকের অবাধ ব্যবহার। যত্রতত্র ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য ড্রেন ও নালার মুখ বন্ধ করে দেয়। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে না পেরে রাস্তায় জমে যায়, যা সাম্প্রতিক সময়ে জনদুর্ভোগ চরম আকারে বাড়িয়ে দিয়েছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের অবাধ ব্যবহার রাজধানীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরকে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকমুক্ত করতে না পারলে এবং ড্রেন-সুয়ারেজ ব্যবস্থার সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
জানা যায়, বাংলাদেশ ২০০২ সালে প্রথমবারের মতো পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। কিন্তু তাতে দেশে পলিথিনের ব্যবহার কমেনি, বরং বেড়েছে। রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে প্লাস্টিক বর্জ্য ও পলিথিন ব্যাগ।
জার্মানির হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণা বলছে, ঢাকা মহানগর প্লাস্টিক ও পলিথিনের বোমার ওপর বসে আছে। এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বড় বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। বাস্তবেই ঢাকা শহরে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, কাজলা, কুতুবখালী, নিকুঞ্জ, প্রগতি সরণি, উত্তরা, মিরপুর ও মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অনেক স্থানে যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দশম স্থানে রয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এর ব্যবহার তিন গুণের বেশি বেড়েছে। ঢাকায় একবার ব্যবহারের পর এগুলোর ৮০ শতাংশ মাটিতে ফেলা হচ্ছে। সেখান থেকে নালা ও খাল হয়ে নদীতে পড়ছে। সর্বশেষ ঠাঁই হচ্ছে বঙ্গোপসাগরে। নদী হয়ে সাগরে যাওয়া বর্জ্য প্লাস্টিক ও পলিথিস দূষণে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে।
সরেজমিন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, বৃষ্টির কিছুক্ষণের মধ্যেই রাস্তাজুড়ে পানি জমতে শুরু করে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ড্রেন ও খালগুলোর পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা অনেক আগেই কমে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টির পানিও দ্রুত নামতে পারে না।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেন, ‘প্রতিবার বৃষ্টি হলেই ড্রেনের নোংরা পানি রাস্তায় উঠে আসে। মানুষকে সেই পানির মধ্য দিয়েই চলাচল করতে হয়। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন।
মিরপুর এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী মোজাম্মেল হোসেন আরও জানান, ‘বৃষ্টি একটু বেশি হলেই কোমরসমান পানি জমে। পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় পানি যাওয়ার কোনো পথ নেই।’
ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসান আহমেদ তৌফিক ঢাকায় পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহারের সঙ্গে জলাবদ্ধতার সম্পর্কিত সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, বর্ষায় মৌসুমি ফল বিক্রির সঙ্গে ঢাকায় পলিথিনের ব্যবহার বেড়ে যায়।
ওই পলিথিনের বড় অংশ মাটিতে ফেলা হয়, যা বৃষ্টির পানির সঙ্গে নালা হয়ে খাল, নদী ও ভূগর্ভে জমা হচ্ছে। ফলে বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে। গবেষণায় দেশের ছয় ধরনের প্লাস্টিক-পলিথিন দূষণের প্রভাব চিহ্নিত করা হয়েছে।
তাতে বলা হয়, দেশে বছরে ১৭ হাজার টন পাতলা প্লাস্টিক ও পলিথিন মাটিতে পড়ছে। এর ৭৩ শতাংশ মাটি ও পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। পানি ও খাবারের সঙ্গে মিশে তা মানুষের শরীরে যাচ্ছে। এতে মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া থেকে শুরু করে চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্নায়ুজনিত রোগসহ নানা রোগবালাই বাড়ছে।
জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যাপক ব্যবহার। সরেজমিন রাজধানীর কয়েকটি ভাঙারি ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য সংগ্রহ কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি দোকানে শত শত কেজি প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন মজুদ রয়েছে।
পাঁচটি দোকানে কথা বলে জানা যায়, এসব বোতল ও প্লাস্টিকের বড় অংশই ড্রেন, সুয়ারেজ লাইন এবং খাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। সংগ্রহকারীরা প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব বর্জ্য তুলে এনে বিক্রি করেন।
একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বৃষ্টির পরে ড্রেন ও সুয়ারেজ থেকে সবচেয়ে বেশি বোতল, পলিথিন আর খাবারের প্যাকেট পাওয়া যায়। এগুলোই অনেক সময় পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়।
এদিকে, প্লাস্টিকের বোতল আর পলিথিনের মতো ফেলে দেওয়া বর্জ্য কীভাবে শহরের জলাবদ্ধতার সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে, সেই চিত্র জাতীয় সংসদে তুলে ধরে এ বিষয়ে জনসাধারণকে সচেতন করতে সংসদ সদস্যদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সম্প্রতি (গত বুধবার) সংসদ অধিবেশনে তিনি বলেন, এখানে সকল সংসদ সদস্য উপস্থিত আছেন, আপনাদের সকলের কাছে আমার একটি বিনীত অনুরোধ থাকবে, আসুন আমরা জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করি। সচেতনতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে এই সমস্যাটা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, সামান্য বৃষ্টির কারণে বড় শহরের বেশ একটি এলাকা তলিয়ে গিয়ে মানুষের দুর্ভোগে পড়ার খবর তিনি সংবাদ মাধ্যমে দেখেছেন। এই সমস্যাটি শুধু ঢাকায় না, এই সমস্যাটি বলা যায় সারাদেশেই ছড়িয়ে আছে। ঢাকা শহরে এরকম আছে যেখানে বৃষ্টিতে ড্রেনে পানি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, পানি আটকে যাচ্ছে, ফলে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এই সমস্যা অনেক দিনের।
পরিবেশবিদদের মতে, রাজধানীতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ড্রেন পরিষ্কার করেও স্থায়ী সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ময়লার স্তূপ, অপরিষ্কার ড্রেন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এ বিষয়ে নগর বিশেষজ্ঞ ও আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, জলাবদ্ধতা এখন শুধু ড্রেনের সমস্যা নয়, এটি নগর ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্লাস্টিক বর্জ্যরে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহির অভাব পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে খাল, ড্রেন ও জলাধার দখলমুক্ত করে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ। নিয়মিত ড্রেন ও সুয়ারেজ পরিষ্কার কার্যক্রম। খাল ও জলাধার পুনরুদ্ধার।
আধুনিক ও সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন, ওয়ার্ডভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার, নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা। সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর সড়ক ডুবে যাওয়া এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ড্রেনে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিবছরই বাড়ছে জলাবদ্ধতার প্রকোপ।
শুধু ড্রেন পরিষ্কার নয়; রাজধানীকে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকমুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ঢাকার জলাবদ্ধতা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে না।